বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাংলার মানুষ তখনো জানত না বঙ্গবন্ধুর ভাগ্যে কী হয়েছে। তিনি কি বেঁচে আছেন, নাকি মৃত্যু হয়েছে। যা–ই হোক না কেন, চিরদিন তিনি এ দেশের মানুষের অন্তরে বেঁচে থাকবেন মুক্তির কান্ডারি হিসেবে। বেঁচে থাকতেই তিনি হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তি। ইয়াহিয়া যদি মনে করেন তাঁকে নিঃসঙ্গ আটকে বাঙালিদের শাস্তি দিচ্ছেন, তাহলে তিনি বড় ভুল করছেন। কারণ, পূর্ব বাংলার মানুষের হৃদয়ে অদৃশ্য তিনি অনেক বেশি শক্তিশালী। বাঙালি তাঁর নামেই যুদ্ধ করছে। জীবন উৎসর্গ করেছে।

বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়েই পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। বন্দী অবস্থায় বিশ্বব্যাপী আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে সামরিক আদালতে বিচার হবে— সামরিক জান্তার এমন ঘোষণায় বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব প্রতিবাদ–বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।

প্রহসনের বিচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ
৯ আগস্ট বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, শেখ মুজিবের কিছু হলে পাকিস্তানই ধ্বংস হবে। তিনি বিশ্বের সব গণতন্ত্রমনা, স্বাধীনতাকামী ও ন্যায়বিচারপ্রত্যাশী দেশের জনগণের প্রতি প্রহসনের বিচার বন্ধের আবেদন জানান। ১০ আগস্ট তিনি বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তির জন্য বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধান ও জাতিসংঘের মহাসচিবকে উদ্যোগ নেওয়ার আবেদন জানান।

১১ আগস্ট লন্ডনের হাইড পার্কে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে ১৫ হাজার মানুষ উপস্থিত হন। এ সভায় উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তিনি বঙ্গবন্ধুকে শান্তির দূত ও নতুন জাতির নেতা হিসেবে অভিহিত করেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনরক্ষায় যুক্তরাজ্যকে ভূমিকা নেওয়ার অনুরোধ করেন।

default-image

১২ আগস্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেন। এতে তিনি বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর কাছে বঙ্গবন্ধুর বিচার বন্ধের আবেদন করেন। ১৩ আগস্ট তিনি পাকিস্তানকে হুঁশিয়ার করেন, বঙ্গবন্ধুর কিছু হলে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় বিপর্যয় নেমে আসবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক বুদ্ধিজীবী কলকাতায় ছিলেন। ১৩ আগস্ট পাঁচজন বুদ্ধিজীবী মার্কিন ও সোভিয়েত দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করেন। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য দূতাবাসকে হস্তক্ষেপ করতে বলেন। ২৬ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) কাউন্সিল সভায় বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবি করা হয়।

জাতিসংঘের উদ্বেগ

তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্ট এক বিবৃতিতে পাকিস্তানকে হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্য নিয়ে নতুন করে বাড়াবাড়ি করলে তার প্রতিক্রিয়া অনিবার্যভাবে পাকিস্তান সীমান্তের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ প্রতিনিধিরা যে অনুভূতি প্রকাশ করেছেন, তা তিনি অনুধাবন করতে সক্ষম। সামরিক আদালতে বিচার সংবেদনশীল ও জটিল একটি বিষয়। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ ছাড়াও মানবিক বিবেচনায় বিভিন্ন মহলে এই বিচার উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তিনি প্রায় প্রতিদিন জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পূর্ব বাংলার উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সংবাদ পাচ্ছেন।

বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া

ভারত
তখন শরণ সিং ছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ৯ আগস্ট তিনি এই প্রহসনের বিচারের প্রতিক্রিয়া দেখান। তিনি বলেন, শেখ মুজিবের কোর্ট মার্শাল হলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। তাঁর প্রহসনমূলক বিচার মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এটা হবে সারা পৃথিবী থেকে নিন্দা হওয়ার মতো ঘটনা। তিনি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি বিশ্ববাসীকে জানান। তাঁদের কোনো ক্ষতি হলে বাংলাদেশে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। আর এর দায় পাকিস্তানের শাসকদেরই নিতে হবে। এ ব্যাপারে লোকসভার ৫০০ সদস্য একমত হন। ১০ আগস্ট তিনি জাতিসংঘের মহাসচিবকে একটি বার্তা পাঠান। এ বার্তায় বঙ্গবন্ধুর বিচার শুরুর ব্যাপারে পাকিস্তানের ঘোষণায় সবার মর্মাহত হওয়ার কথা বলেন। এমন প্রহসনের বিচারে ইন্দিরা গান্ধী ভীষণ বিচলিত হন। ১০ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর জীবনরক্ষার জন্য তিনি ২৪টি দেশের কাছে আবেদন করেন। ওই আবেদনে তিনি কথিত বিচারের আড়ালে বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে তাঁদের প্রভাব খাটাতে অনুরোধ করেন।

আমেরিকা
আমেরিকাসহ প্রায় গোটা বিশ্ব বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে আমেরিকার কংগ্রেসম্যান কর্নেলিয়াস গালাঘর বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের সামরিক সরকারকে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের জন্য তাঁর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।

১৭ আগস্ট ‘হেরাল্ড ট্রিবিউন’–এ উল্লেখ করা হয়, সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি বলেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের গোপন বিচার আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসে ও বিশ্বাস করে।
বিশ্বব্যাপী বঙ্গবন্ধুর ছিল এক বিশাল জনপ্রিয়তা। এ জন্য মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের আশঙ্কা ছিল যে ইয়াহিয়ার প্রতি সমর্থনের জন্য মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বের ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে। তাই পাকিস্তানকে হুঁশিয়ার করা হয় যে শেখ মুজিবকে ফাঁসি অথবা দীর্ঘদিন কারাবন্দী রাখা হলে পাকিস্তান আমেরিকার সমর্থন হারাবে।

১১ জন মার্কিন সিনেটর এক যৌথ বিবৃতিতে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে।

১৫ ডিসেম্বর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পত্র লেখেন। সেখানে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বিষয়টি আনেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দুই দিন পর প্রেসিডেন্ট নিক্সন ওই পত্রের জবাব দেন। তিনি তাঁর পত্রে বলেন, সমস্যা নিরসনে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আলোচনা শুরু করতে পারে। আমেরিকা তখনো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিলেও তিনি তাঁর পত্রে বাংলাদেশ নামটি ব্যবহার করেছিলেন।

ব্রিটেন
সে সময় ব্রিটেনের লেবার পার্টির এমপি ছিলেন জন স্টোনহাউজ। আগস্ট মাসে তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ১৩০ জন সদস্যের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য সংসদে একটি প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবে বলা হয়, পূর্ব বাংলায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটছে। এটা বন্ধ করতে হলে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি ছাড়া উপায় নেই। এ ছাড়া লেবার পার্টির এমপি রেজিনাল্ড প্রেন্টিস ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার এলিস ডগলাসকে অনুরোধ করেন শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তার বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য।
১৩ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। তখন কমনওয়েলথ-বিষয়ক ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন আর্থার বটমলি। এ কনফারেন্সে তিনি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সব সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বঙ্গবন্ধুকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের জন্য কথা বলার একমাত্র ব্যক্তি বলে উল্লেখ করেন।

জার্মানি

১৪ আগস্ট জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে বলেন, পাকিস্তানের সামরিক আদালতের নেওয়া পদক্ষেপে তাঁর দেশ উদ্বেগ জানিয়েছে। জনগণের নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও শ্রদ্ধা জানানোর আবেদন জানাচ্ছে। পাকিস্তানের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতের বিচারকার্য বন্ধ করে বিদ্যমান সংঘাতের একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের জন্য পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানায়। চলবে...

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন