বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এবার আসি স্কুল সময়সূচি নিয়ে কিছু কথায়। মাঝেমধ্যে আমার বড্ড হাসি পায়, আবার খারাপও লাগে যে এই ছোট বাচ্চাগুলোকে আমরা শিক্ষকেরা গিনিপিগের মতো বানিয়ে ফেলছি। ভোরে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য মক্তবে পড়ে শিশুরা। সকালের নাশতা খেয়েছ কি খায়নি, আবার বইয়ের বোঝা নিয়ে স্কুলে দৌড়ঝাঁপের তাড়া! কোথায় গোসল আর কোথায় বিশ্রাম! তারপর সকাল নয়টা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত টানা (১ম-২য় শ্রেণি) সমাবেশ, শ্রেণি কার্যক্রম চলতে থাকে। আর তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি সেই সকাল নয়টা থেকে মাঝে বিরতি দিয়ে বিকেল চারটা পর্যন্ত, ভাবা যায়! মনে হয় ওরাও শিক্ষকদের সঙ্গে সঙ্গে চাকরি করছে। কী পেরেশানি তাদের মধ্যে! বিকেল হলেই ঝিমিয়ে পড়েন শিক্ষক, শিক্ষার্থী সবাই। ব্রেনের কাজ এভাবে আসলে জোর করে বসিয়ে রেখে হয় না। তাতে শিখনফল, প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন করে গুটিকয় শিক্ষার্থী মাত্র। বাকিরা যে লাউ সেই কদু হয়ে বসে থাকে সারা বছর। কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এলে, কিছু জিজ্ঞেস করলে এসব অমনোযোগী বিরক্তি ভাব নিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা কিছুই উত্তর দিতে পারে না। এদের নিয়ে টেনশনের অন্ত থাকে না শিক্ষকদের। কারণটা কী? আসলেই এত দীর্ঘ সময় কোনো শিশুই একটি জায়গায় অবস্থান করতে চায় না। শিশুদের মন চঞ্চল, দুর্বার। তারা চায় হাসতে, খেলতে আর মজা করে চলতে। আর আমরা তাদের পাখির খাঁচার মধ্যে বন্দী করে রাখি প্রায় সারাটা দিন। শিশুরোগ ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। শিশুর বেড়ে ওঠার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই আমাদের কাম্য নয়।

আমাদের শিশুদের বেঁধে রাখার মনোভাব পরিত্যাগ করতে হবে। পুস্তকগত জ্ঞান এ জন্যই একজন পরিপূর্ণ ভালো মানুষ হতে আমাদের উৎসাহিত করে না। কর্মক্ষেত্রে দুর্নীতি, ঘুষ আর অসৎ আচরণের বিস্তৃতি এ জন্যই দেশকে রসাতলে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু সনদ, মুখস্থবিদ্যা আর শাস্ত্রীয় জ্ঞানকে আমরা প্রাধান্য দিই। একটি শিশু চারাগাছ। তাকে গোড়া থেকেই ভালোভাবে পরিচর্যা করতে হবে। নীতিনৈতিকতা আর সৎ চরিত্র আর সু-অভ্যাস গঠনই প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। কাউন্টিং-নির্ভর পড়ালেখা আমরা চাই না। খেলার ছলে শিশু নিজেকে আবিষ্কার করুক, জানুক আর শিখুক অল্প সময় নিয়ে। ক্লাস ঘণ্টার কাঁটায় নয়, বরং গুণগত শিক্ষা ৩০ মিনিটেই সম্ভব বলে মনে করি। অযথা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিরক্তি নিয়ে বসিয়ে রাখার চেয়ে ফলপ্রসূ ক্লাস অল্প সময়েই মনে স্বতঃস্ফূর্ততা আনয়ন করবে বলে বিজ্ঞজনেরা মনে করেন।

প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের শ্রেণি কার্যক্রম দেড় থেকে দুই ঘণ্টাই যথেষ্ট। শিশুদের খিদে লাগে ঘন ঘন। এটাও শিশুর লেখাপড়ায় অমনোযোগিতার অনেক বড় অন্তরায়। তাই সব দিক বিবেচনা করলে প্রাথমিকে সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত দুই শিফটে ক্লাস শেষ করা উচিত। এর বেশি কোনোক্রমেই শ্রেণি কার্যক্রম চালানো কোনো সুফল বয়ে আনবে না। অন্যথায় কাগজে-কলমেই কেবল শিক্ষা আর নথিপত্র পরিপত্র জারির মধ্যেই লৌকিক সফলতা দেখা যাবে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার মান গুণগত দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে পড়বে। শিক্ষকেরা সমাজের আলো, জাতি গড়ার কারিগর। তাঁদের সম্মানের দৃষ্টিতে দেখলে কারও মনে এই অভিযোগ আসার কথা নয় যে সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত শিক্ষকদের বেঁধে রাখলে বেতন উশুল হয়। এটা কোনো ব্যাংক নয়। অর্থনীতির সঙ্গে শিশুর শিক্ষার কোনো লেনাদেনা নেই। তাই যেটুকু প্রয়োজন, সেটুকু সময় দিয়েই সফল, শিখনফল স্থায়ী ও ফলপ্রসূ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি নির্ধারণ করা, এটা এখন সময়ের দাবি।
*লেখক: পারভীন আকতার, শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম।

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন