default-image

সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসের মহামারিতে থমকে গেছে মানুষের ব্যস্তময় জীবন এবং ক্ষতিগ্রস্ত সব কর্মকাণ্ড। তেমনি বাংলাদেশও থমকে গেছে। সেই সঙ্গে আটকে গেছে শিক্ষার্থীদের জীবন। গেল কয়েক মাস মোটামুটি আক্রান্তের সংখ্যা কম থাকায় সবকিছু ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু হঠাৎ আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় কঠোর আইনের দিকে যাচ্ছে সরকার। ইতিমধ্যে সারা দেশে লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার। বন্ধ করে দিয়েছে লঞ্চ, বাসসহ অন্যান্য গণপরিবহনও ।

গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে কোচিং সেন্টারসহ প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা প্রথমত স্থগিত করেছে সরকার। পরে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলের মূল্যায়ন প্রকাশ করা হয়।

বন্ধের এ সময়ে শিক্ষার্থীদের বাড়িতে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী অনেকটা ঘরবন্দী অবস্থায় আছে। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থী পৌনে দুই কোটির মতো। আর মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী এক কোটির ওপরে। একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, অন্যদিকে কোচিং বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ওপর প্রভাব পড়ছে। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীরা বাসায় বন্দিজীবন কাটাচ্ছে।

যেখানে শিশুশিক্ষার্থীরা ভোর থেকে পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিত, সেখানে এখন মিলছে ভিন্ন চিত্র। বিদ্যালয়ের কথা ভুলে গিয়ে এখন তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ছে প্রযুক্তি গেমসে।

সাধারণত বাচ্চারা পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় মগ্ন থাকতে ভালোবাসে, কিন্তু এ সময়ে তারা প্রযুক্তি গেমসকে বেঁচে নিয়েছে। অনেক অভিভাবকেরা অনিচ্ছাকৃত হাতে তুলে দিচ্ছেন এ গেমসকে। ঘরে রাখার জন্যই তারা এ উপায় অবলম্বন করছেন। এতে শিক্ষার্থীরা একঘেয়ে হয়ে পড়ছেন।

এ বিষয়ে কয়েকজন শিক্ষাবিদের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, ডিজিটাল গেমস শিশুদের ওপর মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক প্রভাব ফেলে। এ ক্ষেত্রে মায়েদের বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশুদের বেশি বেশি গল্প শোনাতে হবে। চিত্রকলা, গান, নাচ প্রভৃতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হয়, এমন খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখা গেলে প্রযুক্তি আসক্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

বিজ্ঞাপন

মা মানেই হচ্ছেন শিশুদের শিক্ষক, চিকিৎসক ও দেখাশোনার জন্য দায়িত্বশীল একজন অভিভাবক। কথা বলেছিলাম ভোলার এমন কয়েক নারী অভিভাবকের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে দুজন হলেন তাসলিমা ও রাজিয়া সুলতানা।

তাসলিমা একজন গৃহিণী। তাঁর তিন সন্তান। বাবা প্রবাসী। সেই সুবাদে পরিবারের সব দায়িত্ব এখন তাসলিমার ওপর। সন্তানদের দায়িত্ব ও সংসারের সবকিছু তিনি একাই সামলান। তবে করোনায় তাঁকে একটু বেশি দায়িত্বের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আগে সকাল হলেই বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলে যেতাম এবং স্কুল শেষে আবার বাসায় নিয়ে আসতাম। বাকি সময়টা বাচ্চারা প্রাইভেট টিচার আর কোচিং নিয়ে ব্যস্ত থাকত। আমি তখন শুধু ওদের মনিটরিং করলেই চলত। কিন্তু এখন মহামারি করোনাভাইরাসের জন্য সবকিছু বন্ধ করে দেওয়ায় বাচ্চাদের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। বড়টা কিছুটা কথা শুনলেও মেজ ছেলেটা একেবারেই নাছোড়বান্দা। তেমন কোনো কথা শুনতেই চায় না। ছেলেটা এখন পড়াশোনার চেয়ে বেশি আসক্ত হয়ে পড়েছে মোবাইল গেমসের ওপর। এতে যদি ছেলেকে বাধা দেওয়া হয়, তখন তার হাজারটা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ছেলের কথা হলো, “আর কত দিন এভাবে বাসায় থাকব। আগে বিকেলে সাইকেল চালাতাম, এখন তা–ও দাও না। বাইরে গেলে মাস্ক পরতে হচ্ছে, হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা লাগছে। এভাবে আর ভালো লাগে না।” তাই বাচ্চাদের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে বাধ্য হয়ে প্রযুক্তি গেমস ব্যবহারের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছি।’

রাজিয়া সুলতানা শিল্পীর দুই সন্তান। বড় মেয়ে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আর ছোট ছেলে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবা মো. হুমায়ুন কবির একজন কলেজপ্রভাষক। শিল্পী একজন অদম্য নারী। তিনি শিক্ষকতা পেশা যথাযথভাবে পালন করার পাশাপাশি পরিবারের রান্নাবান্না, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, হাতের কাজ ও শিক্ষক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। করোনা মহামারিতে তাঁর চলমান জীবন এখন আটকে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘বাসায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সন্তানকে সামলানো। ছেলে এমনিতেই প্রযুক্তি গেমসে আসক্ত। বাসার বাইরে যেতে বাধা দেওয়ায় সে এখন এটাকে প্রধান কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছে। কোনো কিছুতেই এ থেকে তাকে সরানো যাচ্ছে না। বাধা দিলে উল্টাপাল্টা জবাব দেয় অথবা বোনের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করে দেয়। তাই নীরবে এখন সয়ে যাচ্ছি।’

তবে এ সমস্যা শুধু তাসলিমা আর শিল্পীর নয়। এ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন প্রতিটি পরিবারের অভিভাকেরা। এ সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সময়ে শিশুদের বেশি বেশি গল্প শোনাতে হবে। চিত্রকলা, গান, নাচ প্রভৃতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হয়, এমন খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখা গেলে প্রযুক্তি আসক্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

*লেখক: এম শরীফ আহমেদ, তরুণ উদ্যোক্তা, স্বেচ্ছাসেবী

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন