default-image

কেবল স্কুল–কলেজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চৌহদ্দির মধ্যেই শিক্ষাজীবন শেষ হয় না। মানুষ শিক্ষিত হতে থাকে প্রতিদিন। এটা একটা নিরন্তর চর্চার বিষয়। হিরে এমনিতেই জ্বলজ্বল করে না। তাকে ঘষতে হয় মাজতে হয় কাটতে হয়। মেধাও তা–ই। মেধাকে চর্চার মধ্যে রেখে নিত্য নিয়ত শাণিত করতে হয়।  

নিজের শিক্ষাজীবনের কথা যখন ভাবি, তখন আব্বার কথা মনে হয়। সারা জীবনের শিক্ষকদের এক পাল্লায় রেখে অন্য পাল্লায় আব্বাকে রাখলে আব্বার পাল্লাই ভারী বলে মনে হয় এখন। তিনি আমাকে অঙ্কের সূত্র, জ্যামিতির উপপাদ্য বা আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে পাঠদান করেছেন, এমন নয়। এই পরিণত বয়সে, আমি নিজেই যখন সন্তানের পিতা, যখন পেছন ফিরে নিজের জীবনকে দেখি, মনে হয়, পিতা–মাতাই সন্তানের জীবনব্যাপী শিক্ষক হয়ে উঠতে পারেন, যদি তাঁরা সন্তানের মনে স্বপ্ন, বিশ্বাস প্রোথিত করতে আর দ্রব্যকেন্দ্রিক সুখের অসারতা শিখিয়ে দিতে পারেন। আজ আমার পিতার কয়েকটি কথা বলতে চাই।

১.
ক্লাস সেভেনে পড়ি। আব্বার সঙ্গে দাদার বাড়ি যাচ্ছিলাম। তখন আমাদের গ্রামের বাড়ির পেছনের কুমার নদে ভরা জল। খেয়া নৌকায় নদী পার হয়ে বাপ–বেটা হাঁটছি। এক পাশে নদী, অন্য পাশে সবুজ ধানখেত। পড়ন্ত বিকেলে চারপাশের মৌনতাতেও যেন মিশে আছে গভীর ছন্দ।

হঠাৎ আব্বা থামলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন লাগছে হাটতে?’ আমি বললাম, ‘ভালো’। আমার দিকে না তাকিয়েই উনি কেমন অদ্ভুতভাবে বলে উঠলেন, ‘এই নদীর মালিক তুমি না। এই ধানখেতও তোমার না। এই নরম রোদের, আলোর মালিক তুমি–আমি কেউ না। কিন্তু এই সব মিলিয়ে যে আনন্দ, যে অনুভূতি, তা সম্পূর্ণ আমাদের। আনন্দে থাকতে চাইলে সবকিছুর মালিকানা থাকতে হবে—এমন নয়।’

সেই থেকে আনন্দের ধারণাই বদলে গেছে আমার জীবনে। নিজের মালিকানায় সব নিতে হবে এই নিরন্তর প্রতিযোগী মনোভাবের চক্র থেকে উদ্ধার পেয়ে নিরাসক্ত মনে জীবনকে উপভোগ করতে শিখেছি। গাড়ি, বাড়ি, জমি, চাকরি, ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠার তথাকথিত ‘সুখচক্রের’ হাতছানি থেকে বেরিয়ে জীবনের উন্মুক্ত আনন্দ ছড়িয়ে গেছে জীবনে।

২.
আরেকবার, তখন  ক্লাস টেনে পড়ি। আমাদের তখনকার জেলার কুষ্টিয়ায় গেছি আব্বার সঙ্গে। সাড়ে ১২টার লোকালে আলমডাঙ্গা ফিরব। কিন্তু স্টেশনে গিয়ে দেখা গেল, ট্রেন অনেক লেট। আব্বা বললেন, ‘চল, এই ফাঁকে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে আসি।’ গেলাম আব্বার বন্ধুর বাসায়, তিনি তখন কুষ্টিয়া শহরের নামকরা উকিল, স্টেশনের কাছেই বাসা।

চাচা বাসায়ই ছিলেন। আমরা বসার ঘরে বসলাম। খুব খিদে লেগেছে আমার। দুই বন্ধু গল্প করছেন। আমার সময় যেন কাটে না। এমন সময় দেখি এক লোক বড় দুইটা কাঁঠাল নিয়ে বসার ঘরের ভেতর দিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল। পাকা কাঁঠালের গন্ধে ঘর ভরে উঠল। আব্বার প্রশ্নের জবাবে মাহবুব চাচা বললেন, ‘গ্রাম থেকে নিয়ে এল, খাবি নাকি?’ আমার মতো আব্বাও নিশ্চয়ই ক্ষুধার্ত ছিলেন। তা ছাড়া বন্ধুর বাড়ি। বললেন, ‘আনতে বল।’

default-image

বড় গামলাভর্তি পাকা কাঁঠাল এসে গেল। আব্বার চাহিদামতে লেবু আর লবণও এসে গেল। আব্বা লেবুর রস আর লবণ ছিটিয়ে দিলেন কাঁঠালের কোয়াগুলোর ওপর। তারপর বাপ–বেটার খাওয়া শুরু হলো। দুজনেরই তখন ভাতের খিদে। অগত্যা ঝাল ওঠাচ্ছি কাঁঠালের ওপর। আব্বা চাচাকে বললেন, ‘তুই খাচ্ছিসনে ক্যান?’ চাচা বললেন, ‘না রে খাব না, ডাক্তারের নিষেধ, তোরা খা।’ যাহোক, আমরা গামলা শেষ করে বিদায়টিদায় নিয়ে স্টেশনের পথে হাঁটা দিলাম।
বাপ–বেটা হাঁটছি। আব্বার লম্বা পায়ের সঙ্গে তাল মেলাতে আমি প্রায় দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছি। আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম,
- ‘আপনারা তো এক ক্লাসেই পড়তেন?’
- ‘হু।’
- ‘আপনি নাকি ক্লাসে ফার্স্ট হতেন?’
- ‘হু।’
- ‘তাহলে মাহবুব চাচা কুষ্টিয়া শহরে বাড়ি গাড়ি করে এত প্রতিষ্ঠিত আর ভালো ছাত্র হয়ে আপনার কী লাভ হলো? আপনি কী করলেন?’
আব্বা একটু যেন থামলেন। আমার দিকে হাসিমাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি কী করলাম? ক্যান, দেখলি না, আমি ওই যে এক গামলা কাঁঠাল খাইলাম’…বলেই হো হো করে সেই পাখি ওড়ানো হাসি হাসতে শুরু করলেন। সেই থেকে প্রতিষ্ঠার সংজ্ঞা বদলে গেল আমার জীবনে।

বিজ্ঞাপন

৩.
একবার ঈদের আগে তিনি বললেন, তোমাদের কারও জন্য এবার কোনো উপহার দিতে পারব না। শুনে আমাদের মুখ ভার। তখন বললেন, আচ্ছা, এমন একটা জিনিস আনব, যা তোমরা সবাই (আমরা তখন ছিলাম ছয় ভাইবোন) একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারবে। সবাই ভাবছি, কী না কী আনেন।

ঈদের আগের দিন রাতে বাসায় ফিরলেন। হাতে একটা গ্লোব। আমাদের সবাইকে গোল করে বসিয়ে গ্লোবের ওপর হারিকেনের আলো ফেলে তিনি আহ্নিক আর বার্ষিক গতি বুঝিয়েছিলেন। রাত আর দিন বুঝিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ওপর যখন আলো পড়ছিল, আমেরিকায় তখন ছিল অন্ধকার। ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ বোঝাতে তিনি গ্লোবের একেবারে ওপরের দিকের নরওয়ে নামক দেশটি দেখাচ্ছিলেন। বলছিলেন এখানে গভীর রাতে সূর্য উঠে যায়, বছরে কখনো দীর্ঘ রাত হয় আবার কখনো দীর্ঘ দিন। আমি ভালো বুঝছিলাম না, বারবার এটা-সেটা প্রশ্ন করছিলাম। একসময় তিনি খুব সহজভাবে, যেন এটা যখন-তখনের ব্যাপার, এমনভাবে বললেন, ‘তুমি যখন নরওয়ে যাবে, তখন পরিষ্কার বুঝতে পারবে।’ অথচ আর্থিক অবস্থার বিবেচনায় তখন এমনকি ঢাকায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখাও অসম্ভব ছিল আমাদের।

অনেক পরে, ২০০১ সালে যখন আমি সত্যিই নরওয়ে গেলাম। অসলোর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হচ্ছিল, পিতা–মাতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটা করতে পারে, সন্তানের জন্য তা হলো সনাতানের মনে স্বপ্ন তৈরি করে দেওয়া। তারপর এই স্বপ্নই তাকে এগিয়ে নিয়ে যায় বাস্তবের দিকে, তা সে যতই কঠিন হোক না কেন।

৪.
আমার দেখা সবচেয়ে আনন্দময় মানুষ ছিলেন আমার বাবা। চরম বিপদ নিয়েও মজা করতে পারতেন। যেমন তার একটা মেজর সার্জারি হবে (যেটার দুই মাসের মধ্যেই তিনি না–ফেরার দেশে চলে যান)। সকাল থেকে ওটির পোশাক পরিয়ে না খাইয়ে রাখা হয়েছে। নার্স এসে জানালেন, একটু পরেই ওটিতে নেওয়া হবে। আমার মুখ শুকনা। উত্তেজনায় আমি যেন নিজের হার্টবিট শুনতে পাচ্ছিলাম। এমন সময় আব্বা বললেন,
- জীবনে স্যালাইন নিইনি, নিলাম। জীবনের প্রথম অপারেশনও হতে যাচ্ছে। অনেক কিছুই ঘটল! কেবল বাকি থাকল জেলখানার অভিজ্ঞতা! অপারেশন সাকসেসফুল হলে এবার একটা চুরিটুরি করে জেলখানার ভেতরটা দেখে আসতে হবে!

তো এমন সদানন্দ মানুষকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনার জীবনে দুঃখ কী?’ আব্বা বলেছিলেন, ‘তিন বছর বয়সে মা হারিয়েছি। মায়ের চেহারা মনে করতে পারি না, খুব চেষ্টা করি। একটা আবছা অবয়ব মনে ভাসে, আবার মুহূর্তে হারিয়ে যায়। এই দুঃখ ছাড়া আমার আর কোনো দুঃখ নেই।’

default-image

৫.
এই ছিলেন আমার পিতা। থানা সার্কেল অফিসের (যাকে এখন উপজেলা বলা হয়) হেড ক্লার্ক। অফিসে সারা দিন টাইপ করতেন। আঙুলের কয়েক জায়গায় কড়া পড়ে গিয়েছিল। ব্যথা হতো। আমার আঙুল ছিল চিকন। কাজে ছিল পারফেকশনের ঝোঁক। তাই ঘড়িতে প্রতি রাতে ‘দম দেওয়া’র কাজটা দিয়েছিলেন আমার ওপর। বংশে বা পেশায় কুলীন না হলেও অন্য অনেক কিছুর মতো, শব্দ চয়নে তিনি কুলীন ছিলেন। সবাই যখন বলত ‘দম দেওয়া’, আব্বা বলতেন, ‘চাবি দেওয়া’।

তখন সবার ঘড়ি ছিল না। সারা পাড়ায় সাকল্য গোটা কয়েক। উপার্জন বিচারে তাঁরও ঘড়ি থাকার কথা ছিল না। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ‘বিলাসী’ ছিলেন। ভূপৃষ্ঠের অল্প যা কিছুর প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল, তার মধ্যে ছিল ঘড়ি। তিনি বলতেন ‘রিস্ট ওয়াচ’।
২০০৬ সাল। দুজনে টিভি দেখছি। টাইটানের একটা বিজ্ঞাপন শেষ হলে বললেন, ‘একটা অটোমেটিক রিস্ট ওয়াচ কিনে দিস তো বাপ, তারিখ আর বার যেন থাকে।’ কিছুদিন পরই আমার আমেরিকা যাওয়ার ডেট। ভাবলাম, এক বছর পর ফেরার সময় নিয়ে আসব। সময়কে থামিয়ে দিয়ে, দেড় মাসের মাথায়, তিনি চলে গেলেন! দূর প্রবাস থেকে আমি তাঁর জানাজাতেও অংশ নিতে পারলাম না।

যাঁদের বাবা-মা বেঁচে আছেন, তাঁদের বলছি, পরে দেব, পরে করব ভেবে কিছু ফেলে রাখবেন না। উজাড় করে দিন, সবকিছু...সব। ‘করতে পারতাম কিন্তু করিনি’ এমন একটাও আফসোস যেন না থাকে আমাদের।
‘এই মাটিতে পিতঃ তোমার চরণ স্পর্শ আছে
তাই এই মাটি, স্বর্গসম, মধুর আমার কাছে।
এই হাওয়াতে বাবা তুমি নিয়েছিলে শ্বাস
তাই এই হাওয়া স্নিগ্ধ হলো, তাই এত সুবাস।’

*লেখক: একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত, ই–মেইল [email protected]

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন