বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২.

খুব ছোটবেলায় মাকে হারানো পরীমনির দাদাবাড়ি নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায়। পরীমনি বড় হয়েছেন নানাবাড়িতে। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার সিংহখালী গ্রামের নানাবাড়িতেই। অবশ্য এলাকাবাসী অনেকে তাঁকে পরীমনি হিসেবে নয়, বরং চেনেন স্মৃতি নামেই। তাঁর আসল নাম শামসুন্নাহার স্মৃতি। স্মৃতি ওরফে পরীমনি ছোট থেকে ভালো ছাত্রী ছিলেন। পঞ্চম শ্রেণিতে তিনি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান। মেধাবী হওয়ায় পরীমনিকে নিয়ে এখনো গর্ববোধ করেন তাঁর স্কুল-কলেজের শিক্ষকেরা। ছোটবেলা থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহ ছিল পরীমনির। পরীমনি অভিনয়ে ও নাচে নিজের বিদ্যালয়ে এবং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে অনেক পুরস্কার অর্জন করেছেন। মা-বাবাহীন পরীমনি ২০১৫ সালে নাম লেখান চলচ্চিত্রে। পরীমনি মডেলিংয়ের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। মডেলিং থেকে ছোট পর্দায় এবং তারপর রুপালি পর্দায় অভিনয় শুরু করেন পরীমনি। মুক্তির আগেই ২৩টি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছিলেন পরীমনি। মা-বাবা এবং অভিভাবকহীন পরীমনি একা একা চলার পথে ভুলত্রুটির শিকার হয়েছেন। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজের পুরুষেরা পরীমনিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে কিন্তু সঠিক পথে চলার নির্দেশনা দেয়নি। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত চলচিত্র পরিচালক কাজী হায়াৎ যথার্থই বলেছেন, ‘পরীমনির সৌন্দর্যই পরীমনির শত্রু। বেশির ভাগ মানুষ, যাঁরা তাঁর সান্নিধ্যে গিয়েছেন বা যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাঁরাই তাঁকে বিপথে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। পরীমনির সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে যাঁরা তাঁর কাছে গিয়েছেন, তাঁরা কেউই পরীমনিকে সুন্দর পথের সন্ধান দেননি। তাঁরা পরীমনির সৌন্দর্যকে শিল্পসৃষ্টির কাজে লাগাননি।’
ফেসবুকের আদালতে পরীমনিকে ‘রাতের রানি’ বলে গালি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে পরীমনিকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে আমরা কতজন দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করেছি? তাঁর একটা সুন্দর আর হৃদয়বান মনের খবর কতজন রেখেছি? অভিনেতা সিয়াম আহমেদ বলেন, ‘পরীমনি মানুষের জন্য অনেক করেছেন। তিনি অনেক অনাহারীকে খাইয়েছেন। সংসার চলে না, এমন অনেককে সহযোগিতা করেছেন। চোখের সামনে অন্যের জন্য পরীমনিকে কিছু করতে দেখেছি।’ স্বনামধন্য চিত্র পরিচালক কাজী হায়াৎ বলেন, ‘মেয়েটি ভালো, শিল্পমনা এবং প্রচণ্ড হৃদয়বান। আমাদের দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে এমন হৃদয়বান মেয়ে আগে আসেনি। সে খুব দানশীল।’
পরীমনিকে অনেক সম্ভাবনাময় উল্লেখ করে কাজী হায়াৎ বলেন, ‘পরিচালক-প্রযোজক সবারই উচিত পরীমনির জন্য সুন্দর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। যারা তাকে নিয়ে কাজ করবে, তারা যেন ওকে সঠিকভাবে গাইডও করে। আর কেউ যেন পরীমনিকে মিসগাইড না করে।’ ঢালিউডের জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খান পরীমনি ইস্যুতে বলেন, পরীমনি ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তাঁর আগামী জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি আরও বলেন, পরীমনি মা-বাবাহীন। তাঁর বেড়ে ওঠা পারিবারিকভাবে আর পাঁচটা তরুণ-তরুণীর বেড়ে ওঠা এবং স্ট্রাগলে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। হয়তো সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে পরীমনি অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। পরীমনির গ্রেপ্তারের পর যাদের কাছে প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি ছিল, সেই চলচিত্র শিল্পী সমিতি তাঁর পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি পাশে না দাঁড়িয়ে বরং তাঁর সদস্যপদ স্থগিত করেছে। চলচিত্র শিল্পী সমিতির এ আচরণে আমি এতটুকু অবাক হইনি। বর্তমান সময়ে কেউ একজন কোনো বিপদে বা সমস্যায় পড়লে ব্যতিক্রম ব্যতীত সহকর্মীদের সেভাবে আর এগিয়ে আসতে দেখা যায় না। পরীমনির জীবন আসলেই অভিভাবকহীনতার শিকার একটা লক্ষ্যহীন নৌকামাত্র। তিনি একজন মেধাবী অভিনয়শিল্পী। সঠিক নির্দেশনা পেলে ভুল শুধরে নিয়ে শোবিজে কাজ করলে আরও ভালো কিছু করতে পারবেন।

৩.

প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিষয় আছে, যার অবস্থান গোপন বা একান্তই নিজের জন্য এবং সেটা তার নিজের পৃথিবী। কিন্তু আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায়, অনেকে ব্যক্তিগত বিষয়, ভিডিও ইত্যাদি ফাঁস করে দেয়। শুধু ফাঁসেই আটকে থাকে না, রীতিমতো ভাইরাল করে ফেলে। একজন ব্যক্তির প্রেমের সম্পর্ক থাকতেই পারে, তাই বলে সুযোগ পেলেই হানা দিতে হবে? এটা কি সামাজিক সুস্থতার লক্ষণ? প্রায় এক মাস ধরে পরীমনিকে নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক খবর প্রকাশিত হচ্ছে। মানুষ হিসেবে আমরা কেউই ভুলত্রুটির বাইরে নই। আদালতে মীমাংসা হওয়ার আগেই পরীমনিকে আমাদের কাঠগড়ায় অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলছি। পরীমনির যতটা ভুলত্রুটি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হয়েছে আমাদের মানসিকতার নৈতিক স্খলন। এই একুশ শতকে এসে চিন্তায় ও মননে যেখানে আমাদের আরও সভ্য হওয়া উচিত, সেখানে আমাদের মধ্যে উল্টোটা পরিলক্ষিত হচ্ছে। স্বজাতির কোনো রকম ক্ষতি এবং অপমানে আমরা বুনো উল্লাসে মেতে উঠি। আর ঘটনার চরিত্র যদি নারী হয়, তাহলে তো কথাই নেই। রাতে কি ভদ্র ঘরের মেয়েরা বের হয়? ঘরের বাইরে কাজ করে কেন? পুরুষের অধীনস্থ থাকে না কেন? বিদ্রোহ কেন করে? এ রকম হাজারটা প্রশ্ন ও অশালীন মন্তব্যের জোয়ার বয়ে যায়। আমরা বোঝার চেষ্টা করি না কাউকে শারীরিক ও মানসিক হেনস্তা করার অধিকার কারও নেই, বরং সেটা ভয়ংকর এক কাজ। অবশ্য যেখানে নারীকে কেবল সন্তান উৎপাদনের মেশিন ভাবা হয়। ভাবা হয়, পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে, সেখানে নারী, পুরুষ কিংবা মানবতার অপমান খুবই তুচ্ছ বিষয়।

২৬ দিন জেলে কাটানোর পর পরীমনি জেল থেকে বের হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে হাসিমুখে ভক্তদের উদ্দ্যেশ্যে হাত নেড়ে যেভাবে শুভেচ্ছার জবাব দিয়েছেন, তা এককথায় অতুলনীয়। এটা যদি অভিনয়ও হয়ে থাকে, তবু বলব অসাধারণ। বিপদে ভেঙে না পড়ে হাসিমুখে সবকিছু মোকাবিলা করার শিক্ষা তিনি ভক্তদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। দুঃখে তো সবাই কাঁদে, কিন্তু হাসতে কজন পারে। দুঃখে না কেঁদে যারা হাসতে পারে, তারাই প্রকৃত সংগ্রামী। তারাই দৃঢ়চেতা মনের অধিকারী। আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়, পরীমনির হাতের তালুতে লেখা একটি ইংরেজি বাক্যবিশেষ ‘ডোন্ট লাভ মি বিচ!’ বিপদের সময় যাঁরা দূরে সরে যায়, তাদের প্রতি এক বিশেষ বার্তা। পরীমনি বার্তা দিতে চেয়েছেন, ‘বিপদের সময়ে যদি এগিয়ে না আসো, তবে কিসের বন্ধু তুমি! কাছে এসো না। ভালোবেসো না।’ এটা পরীমনির নিজের ভুল বুঝতে পারার উপলব্ধিও। এসব গুণাবলিই তো আমি আমার চারপাশের লোকের মধ্যে, আমার মায়ের মধ্যে, আমার স্ত্রীর মধ্যে, আমার মেয়ের মধ্যে আর আমার বোনের মধ্যে দেখতে চাই। পরীমনি, লোকে আপনাকে যতই ‘রাতের রানি’ বলে গালি দিক, যা খুশি তা–ই বলুক, আপনি আমার বোন। হ্যাঁ, আপনি আমার আদরের বোন।

*লেখক: অধ্যাপক ড. আবু শামীম মোহাম্মদ আরিফ, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন