default-image

প্রায়ই দেখি চাচা বুথের (একটি ব্যাংকের) এক কোনায় বসে ঝিমুচ্ছেন। কী চাচা, ঘুম? বলতেই আচমকা তাকিয়ে জড়ানো গলায় বললেন, না একটু চোখ লেগে আসছিল। দুপুরে খেয়েছেন? এখনো খাইনি, খাবার আসব। কে দিয়ে যায় খাবার? এই পাশেই একজন দিয়া যায়। এভাবেই আমাদের কথোপকথন শুরু।
চাচা, কিছু মনে না করলে আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?
জি বলেন।
কী নাম আপনার?
নুরু মিয়া।
দেশের বাড়ি কোথায়?
ঢাকায়। আমাগো বাপ-চাচারাও এখানকার আদি বাসিন্দা।
আদি নিবাস ঢাকায়। কিছুদিন কাজ করেছেন লালবাগের একটা কারখানায় দারোয়ান হিসেবে

কারাখানায় কত বেতন পেতেন?
পাঁচ হাজার টাকা।
থাকা-খাওয়াসহ?
না, সেসব নিজের।
ঘরে কে কে আছে আপনার?
পরিবার আছে (স্ত্রী), এক ছেলে, দুই মেয়ে। একটা মাইয়া মারা গেছে। তার ঘরে এক নাতি আছে। তাকে আমরই দেহোন লাগে।
কী করে আপনার ছেলে? ভাত-কাপড় দেয় ছেলেমেয়ে?
ছেলে পানি বেচে। না, তারই চলে না। মেয়েও দেখে না। মেয়ের জামাই খাবার হোটেলে কাম করে।

default-image

কীভাবে কাজ পেলেন এখানে?
আমার এক নাতি খোঁজ দিছিল।
লেখাপড়া কিছু জানেন?
না গো মা, জানি না।
তাহলে কীভাবে কাজ পেলেন এখানে?
ট্রেনিং করাইছিল।
সব বুঝতে পারেন?
হ, পারি।

বিজ্ঞাপন

নুরু চাচার কথাগুলো বয়স ও অভাবের ক্লান্তিতে যে খানিকটা জড়ানো, তা বেশ ভালোই বুঝতে পারলাম। জানতে চাইলাম কিছুটা অনধিকার চর্চার মতো...
চাচা, বেতন কত পান বলা যাবে আর কয় ঘণ্টা কাজ করেন?
বেতন তো পাই আট হাজার টাকা, দুই জায়গায় ডিউটি করি। এইখান থেইকা আবার যাই অন্য একটা বুথে। মোট ১৬ ঘণ্টাও হয়ে যায়। কিন্তু বেতন ওই একই।
অসুখ-বিসুখ করলে বা কোনো কারণে না এলে টাকাপয়সা কাটে?
হ্যাঁ কাটে, তহন ধরেন সাত হাজার সাড়ে সাত হাজার পাই।
এই টাকায় ঘরভাড়া, খাওয়া হয়?

ঘরভাড়া দিই চার হাজার টাকা, আর যা থাকে, তা-ই দিয়ে কোনো রকমে চলে পরিবার নিয়ে। পরিবারের তো আবার অসুস্থ।
নুরু চাচা স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন কামরাঙ্গীরচরে। স্ত্রী চার-পাঁচ বছর যাবৎ অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। পাশের কেউ একজন রান্নাবান্না করে দেন। তা-ই খেয়ে কাজে আসেন। দুপুরের খাবার এদিক-সেদিক থেকে এনে খেয়ে নেন।
জিজ্ঞাসা করলাম, চাচা, জমানো কিছু আছে টাকাকড়ি?

না গো মা, কিছুই না। খালি এই জীবনডাই আছে। চোখ বুঝলেই সব শেষ, কী জমাব। কান তাওইয়ে থাহি, কহন যেন খবর আসে আপনার চাচি মারা গেছে।
এই যে লকডাউন চলছে, কীভাবে আসা-যাওয়া করেন অত দূর থেকে?
বাসে আসি, বাস না পাইলে হাঁটেই আসি।
তাহলে কি চান লকডাউন উঠে যাক?
না, তা চাই না। জীবন তো আগে বাঁচানো দরকার।

আচ্ছা নুরু চাচা, এত অভাবেও চাইছেন মানুষের জীবন আগে বাঁচুক, এই যে রোজ এত এত মানুষ হাজার হাজার টাকা তুলে নিয়ে যায়, কেউ কি আপনাকে দু-এক পয়সা দিয়ে যায় কখনো?

না না, কেউ কোনো দিন কিছু দিয়ে যায় না।
চাচা, আজ যাই। আবার এলে কথা হবে। সাবধানে থাকবেন।

অনেকটা সময় নুরু চাচার কাছ থেকে নিয়ে নিয়েছি। তাই সামান্য কটা টাকা হাতে দিয়ে এলাম সময়ের মূল্য হিসেবে। আমরা কেউ ভালো নেই। সবার জীবনেই টানাপোড়েন বাসা বেঁধেছে নুরু চাচার অভাবী জীবনের মতো। পৃথিবী এক অজানা অসুখে ভুগছে। মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। মাথা নত করছে প্রকৃতির কাছে, তবু যেন মুক্তি মিলছে না কিছুতেই।

ভালো থাক নুরু চাচা, ভালো থাক প্রকৃতি। ভালো থাকি মানুষ আমরা।

*লেখক: রোজিনা রাখী, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন