বিজ্ঞাপন

এমন কোনো অনুভূতি খুঁজে পাওয়া বোধ হয় সম্ভব না, যেই অনুভূতিকে আরও অর্থবহ করে তুলে তিনি গান/কবিতা লেখেননি। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা খুব করে মনে পড়ে। তখন বিমান পারস্য উপসাগরের ওপরে উড্ডয়মান, ওই স্থানে তখন সবেমাত্র ভোর হচ্ছে হচ্ছে ভাব। দিগন্ত ছাপিয়ে আলোকশিখা জ্বলে উঠল। নতুন ভোর, নতুন সূর্যরশ্মি। আমি বিমানের পাশের ছোট্ট জানালা তথা পোর্টহোলের পর্দা খানিকটা তুলে দিলাম। পাশের ভিনদেশি সহযাত্রী হয়তো খানিকটা বিরক্তই হলেন! আমি খানিকক্ষণের জন্য অবুঝ হলাম, তাঁকে অপেক্ষা করে বাধ্য হলাম সেই নতুন আলোয় উদ্ভাসিত নীলাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে। সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে বেজে উঠল, ‘এই আকাশে আমার মুক্তি, আলোয় আলোয়।’ গুনগুন করে গাইতেও লাগলাম। আজও মনে হয়, এই গানটা জানা না থাকলে দৃশ্যটা সম্পূর্ণ হতো না। বাঙালি হিসেবে নিজের জীবনকে সম্পূর্ণ করার জন্য হলেও তাই রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হবে, শুনতে হবে, জানতে হবে।

হোক সুখ-দুঃখ, মিলন-বিরহ, ভালোবাসা; কিংবা হোক কোনো নতুনের প্রারম্ভ—রবীন্দ্রনাথ ছিলেন, আছেন, থাকবেন। বোধ করি বসন্ত ঋতু নিজেও নিজ রঙের ভাষা জানত না, ‘বসন্ত এসে গেছে’ গানের আগে। ভালোবাসাও কি নিজ অনুভূতির এত প্রকারভেদ জানত রবীন্দ্র-পূর্ব সময়ে? মনে হয় না। তাঁর ঐশ্বরিক প্রেমের প্রকাশও মিলেমিশে যায় মানবপ্রেমের সঙ্গে। ‘কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া’ পঙ্‌ক্তিতে যেন সব ধরনের প্রেমের সার্থক সম্মিলন ঘটে। একই ভাবে হারানোর বেদনার প্রতিটি স্থানকে তিনি স্পর্শ করেছেন অসামান্যভাবে। ‘দিগন্তের কোন পারে চলে গেল আমার ক্ষণিকা’ বাক্যটিতে যেন মিশে আছে কত না পাওয়ার ছাপ। ছোটগল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হলে হয়তো শেষই হবে না! আমার সব সময়ের প্রিয় গল্প ‘অপরিচিতা’। ব্যক্তিত্বে ভরপুর ‘অপরিচিতা’র সৃষ্টি শত বছর আগে হলেও আজকের সমাজে সে একইভাবে প্রাসঙ্গিক, হয়তো আরও বেশিই প্রাসঙ্গিক। সেই গভীর বার্তাবাহী ছোটগল্পেও নানারূপে প্রকাশিত মানবমনের ব্যাখ্যার অতীত অনুভূতিগুলো।

অনুপমের ‘ওগো অপরিচিতা, তোমার পরিচয়ের শেষ হইল না, শেষ হইবে না; কিন্তু ভাগ্য আমার ভালো, এই তো আমি জায়গা পাইয়াছি’ সংলাপের মধ্য দিয়ে কতজনের মনের কথা প্রকাশিত, তা কে বলতে পারে!

‘শেষের কবিতা’ একাই যেন মানবমনের জগৎকে নিয়ে গড়ে উঠেছে। উপন্যাসের হাজারো নান্দনিক বাক্যের মধ্যে বিশেষ করে অমিতের সেই উক্তি বারংবার মনে পড়ে:
অমরাবতীর কেউ যদি প্রশ্ন করে ‘ভবে এসে করলে কী?’

তখন কোন লজ্জায় বলব, ‘ঘড়ির কাঁটার দিকে চোখ রেখে কাজ করতে করতে জীবনের যা-কিছু সকল সময়ের অতীত, তার দিকে চোখ তোলবার সময় পাই নি।’
এত সহজে এত গভীর কথা বাংলা সাহিত্যে কয়জন বলে যেতে পেরেছেন?
এদিক থেকে চিন্তা করলে ২৫ বৈশাখ দিনটি খুব আলাদা কিছু নয়। বাঙালির জীবনের প্রতিটা দিনই যে রবীন্দ্রঘেরা! আর তাই তাঁকে ছাড়া এক মুহূর্তের জন্যও নিজ অস্তিত্ব কল্পনা করাটা কঠিন, খুব বেশিই কঠিন।

*লেখক: অংকন ঘোষ দস্তিদার, শিক্ষার্থী, ৪র্থ বর্ষ, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন