বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঘটনাটি অন্যান্য ঘৃণ্য অপরাধের মতোই আমাদের মনকে নাড়া দেয়। যারা এসব ঘটনা ঘটায়, তাদের বিবেকবোধ কাজ করে না। তাদের এ কাজটুকু যে পূর্বপরিকল্পিত নয়, তা সহজেই অনুমেয়। নিমেষের সিদ্ধান্তে তড়িৎ গতিতে কাজটুকু সেরে নেয়। তবে এ রকম মনোবিকার তাদের আগে থেকেই প্রভাবিত করে। ফলে তাদের লালসার শিকার হন নববধূ!

মানুষের ধ্যানধারণা ও চিন্তাচেতনা নিজ কর্মে প্রতিফলিত হয়। ইতিবাচক ধারা সমাজের পটপরিবর্তনে সাহায্য করে। নেতিবাচক প্রবর্তনে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। প্রতিটি ধাপে আমাদের চেতনার ভিত্তি সমাজ কিংবা পরিবারেই প্রোথিত হয়। তবে ধর্ষণের মতো ঘৃণিত অপরাধ যারা করে, তারা সমাজে একদিনে তৈরি হয় না। সমাজ তাদের অন্ধকার জগৎ সম্পর্কে ধারণা রাখে। তবে পরিবার কিংবা সমাজ তাদের মতো মানুষের ঔদ্ধত্যের সীমানা খুঁজে পায় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করারও সাহস পায় না। ফলে তারা এসব কাজ করতে দ্বিধাবোধ করে না। অথচ আমাদের তরুণ প্রজন্ম দেশের সম্পদ, দেশের কর্ণধার। তাদের দিকে হাত বাড়িয়ে সমাজ বাঁচতে শেখে, মনে সাহস জোগায়। তারাই সাবলীলভাবে রুদ্ধ সমাজটাকে মুক্ত করে জাগিয়ে তুলতে পারে।

আবার তারাই চেতনার অধিকার হরণ করে সমাজকে কলুষিত করে। লাখাইয়ের মতো সব ঘটনা উগড়ে দেয় সব অপরাধ। আশার খবর, ইতিমধ্যে কয়েকজন আসামি ধরা পড়েছে। আশাকরি বিচারব্যবস্থায় চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য বেরিয়ে আসবে এবং সমাজে এমন গর্হিত কাজ করার সাহস থেকে অনেকেই পিছিয়ে আসবে।

ঘটনাটিকে কোনোভাবেই বিরল ঘটনা বলার সুযোগ নেই। আমাদের প্রযুক্তি আমাদের সীমানা দেখিয়ে দেয়। আমরা প্রযুক্তির সুফলের চেয়ে কুফলকে সাদরে গ্রহণ করি।

যেখানে নিষিদ্ধ, সেখানে নিষিদ্ধের স্বাদ গ্রহণের আনন্দও প্রবল। তাই তো প্রতিনিয়ত নিষিদ্ধের দিকে হাত বাড়াই। হাতে আছে সুন্দর মুঠোফোন। বালকের বালকোচিত মনোজগৎ কি আর স্মার্টফোনের মধ্যে বন্দী থাকে? সহজেই ক্যামেরাবন্দী করতে পারে সবকিছু। মনে হয় চেতনার দীক্ষা এখানেই অসম্পূর্ণ! সম্পদ ও শিক্ষার বৈষম্যে দাঁড়িয়ে থাকা সমাজ যখন লালসার সাধনায় মেতে ওঠে, তখন মনোবিকারের এমন মহামারি জন্ম নেওয়াই স্বাভাবিক। সেখানে সমাজে অভিভাবকোচিত প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে তার পেছনে আরও অনেক ধরনের বিকার থাকে। সেগুলো বহুলাংশে অজানাই থেকে যায়।

অন্যদিকে নতুন প্রযুক্তির প্রতি বয়ঃসন্ধির আকর্ষণ স্বাভাবিক। তাই অপরাধজগতে তাদের পদচিহ্ন সমাজকে আরও কলুষিত করে। আমাদের সমাজে সামাজিক নজরদারি নেই বললেই চলে। তা ছাড়া পারিবারিকভাবেও এতটা কড়া শাসনের মধ্যে তারা বেড়ে ওঠে না। ফলে নাবালক কিংবা কিশোর বয়সে অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে হবিগঞ্জের লাখাইয়ে ঘটনা বিশাল হিমশৈলীর চূড়ামাত্র। তবে সব দায় যে প্রযুক্তির, তা নয়। যে পরিবেশ থেকে অপরাধ দমনের পরিবর্তে তাদের মতো শত শত মনের জন্ম দিচ্ছে, তাদের শোধরাতে হবে। নয়তো সে ধরনের ঘৃণিত অপরাধ বৃদ্ধি পেতেই থাকবে।

আমাদের সুন্দর সমাজ ধর্ষককে সাদরে গ্রহণ করলেও ধর্ষিতকে গ্রহণ করতে অপারগ। প্রতি ক্ষেত্রে তাদের সংগ্রাম করে বাঁচতে হয়। এই লড়াইয়ে কেউ হেরে যায়, আবার কেউ জিতে যায়। তবে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনাই প্রকট হয়ে ধরা দেয়। সমাজব্যবস্থায় তাদের ঠাঁই হয় সবার অগোচরে। অনেকটা অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার মতো। ফলে নারীর স্বতন্ত্রবোধ জেগে ওঠে না। অন্ধকারের গ্লানিময় স্থানকে অতি আপন করে নিতে হয়।

আমাদের দেশে নৈতিক শিক্ষার চর্চা একেবারেই থেমে আছে। সমাজে কাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়, সে জ্ঞানটুকু থেকে যায় অধরা। নামে আমরা নারীদের অর্ধাঙ্গী হিসেবে বিবেচনা করলেও কার্যত কতটুকু সত্য, তা–ই বিবেচ্য। অথচ তাদের প্রতিনিয়তই বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে হয় নির্যাতিত, কিছু ক্ষেত্রে হয় ধর্ষিত!

যদি মেয়েদের মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ জাগিয়ে তোলা যায়, তবে সামাজিকভাবে হীনম্মন্যতা জন্মাবে না। যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও প্রকাশ না করার ভীতি কেটে যাবে। বস্তুত নারী আত্মনির্ভর হতে পারলে সুরক্ষিত জীবন যাপন করতে পারবে।

একজন নারী ধর্ষিত হওয়া মানেই সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থাকে বিকলাঙ্গ করে দেওয়া। তাই স্কুল-কলেজের পাশাপাশি সামাজিকভাবে বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজনের মধ্য দিয়ে সবার মধ্যে জনসচেতনতা তৈরি জরুরি। সে ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকাও রয়েছে। নারীদের বেলায় আইনি সহায়তা কীভাবে পাওয়া যায়, সে বিষয়ে বোধগম্য করতে হবে।
*লেখক: অনজন কুমার রায়, কলাম লেখক ও ব্যাংকার

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন