বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আজকাল কত নামীদামি রেস্তোরাঁ হয়েছে, কফিশপ ও বার হয়েছে; অদ্ভুত ব্যাপার, এসবের কোনোটার নাম–ই বাংলায় নয়। এমন সব উল্টাপাল্টা ইংরেজি নাম এসব দোকানের, শুনলেই মনে হয় কোনো ভিনদেশে আছি। আমার তো ভাবতে অবাক লাগে, এ জেনারেশন ‘বিতান’ শব্দের মানে জানে কি না? অথচ সেই কতকাল আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কত আধুনিক ছিলেন। কী সুন্দর একটা নাম দিয়েছিলেন ‘গীতবিতান’—আহ্‌ কী অপূর্ব নাম! আচ্ছা, এমন নামে দোকান হয় না কেন বাঙালির বাজারে?

default-image

আমি মূল গল্পে ফিরে আসি। অবশ্যই সেটা খাবারের গল্প। আর তা হলো বুফে খাবার। বুফে মানে কী, ভোজনপ্রিয়রা নিশ্চয়ই তা জানেন। তবুও বলি, বুফে মানে একটি খাবার টেবিলে হরেক রকম খাবার সাজানো থাকবে, আপনি সেখান থেকে যতবার খুশি, ততবার খাবার নিয়ে খেতে পারবেন। এই বুফে খাবারের বিশাল আয়োজনে যাওয়ার সুযোগ আমার বেশ কয়েকবার হয়েছিল। কয়েক দিন আগে আমি আবার বুফেতে খেতে যেতে বাধ্য হলাম আমার কাজের উপলক্ষে। সেখানে গিয়ে আমার মনে হয়নি পৃথিবীতে করোনা বলে কোনো রোগ–বালাই আছে। লিফটে উঠতে এবং নামতেই আমার অনেকটা সময় লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। অসংখ্য মানুষের ভিড়, কোনো নিয়ম–কানুনের বালাই নেই। ধানমন্ডির মতো একটি বিলাসবহুল জায়গা, সেখানে মালিকপক্ষ শিক্ষিত, সচেতন ও জ্ঞানী হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না, সেখানে এক বিরাট বিশৃঙ্খলার জটলা। সেখানে শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষের অবাধ ঠেলাঠেলি। মাস্ক নেই কারও মুখে, এমনকি রেস্তোরাঁয় প্রবেশের সময়ও করা হচ্ছে না স্যানিটাইজারের ব্যবহার। সেখানে কিন্তু কেউ ফ্রি খেতে যাচ্ছে না, বরং গুনতে যাচ্ছে প্রচুর টাকা। তাহলে কেন করোনাকালে মানা হবে না বিধিনিষেধ? আমরা আসলে টাকা পেলেই খুশি। তা ছাড়া এত দিন পর খোলা হয়েছে এসব রেস্তোরাঁ; উশুল তো করতেই হবে, তা–ই না?

আর আমরা যারা সেখানে গিয়েছিলাম, তারাও কি মেনে চলেছি স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে খাবার নেওয়া বা খাওয়ার কোনো নিয়ম–কানুন? না, মোটেও মানিনি। এমনকি বাচ্চাদের কথাও ভাবিনি। যে যার মতো ছোটাছুটি করছে, ফটোসেশন করছে। কী আজব দেশ!

শুধু কি তা–ই, এবার বলি খাবারের কথা। একেকজন কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষ যে পরিমাণ খাবার প্লেটে তুলে নিচ্ছেন, দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ। এত খাবার নিশ্চয়ই তিনি একবারে খেতে পারবেন না। তাহলে কেন এই অপচয়? এখান থেকে তো খাবার ভণ্ড প্রেমিকের মতো পালিয়ে যাচ্ছে না। আপনি আয়েশ করে সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে খান। যতবার খুশি, ততবার নিন। কেউ তো বারণ করবে না, তাহলে?

বুফে নিয়ে প্রথম আলোয় একটা গল্পে পড়েছিলাম, এক ছেলে বুফে খেতে যাবে। কদিন আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে আর বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরছে, বুফেতে গিয়ে সে এত্ত এত্ত খাবে! কিন্তু কীভাবে সে এত্ত খাবে, ভেবে পায় না। তাই সে গেল এলাকার শেফ মকবুল চাচার কাছে। বলল, ‘চাচা, বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরেছি। বুফেতে গিয়ে কেমন করে এত্ত এত্ত খাওয়া যায় বলেন তো?’

চাচা বললেন, ‘বাজান, তুমি বরং হুমায়ূন আহমেদ স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করো। তিনি খাদ্যরসিক ছিলেন তো, জানতে পারেন ব্যাপারটা।’ ছেলেটা মন খারাপ করে ফিরে এল। কারণ, হুমায়ূন স্যার তো গত হয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগে।

আসলে যাঁরা ভাবেন, বুফেতে খেতে যাওয়া মানেই হাত খুলে ব্যাট করার মতো, ব্যাপারটা আসলে তা নয়। পেট ভরে গেলেও যাঁদের চোখ ভরে না, তাঁরা অনেক সময় ইনিংসের শেষ বলগুলো যেমন নষ্ট করে দর্শকদের হতাশ করে ফেলেন, তেমনি এসব চোখ না ভরা লোভী খাদক বুফেমালিকদের সর্বনাশ করে ছাড়েন। কথায় আছে, সব বুফেমালিকেরই নাকি কলিজা ফেটে যায় বুফের শেষে, যখন তাঁরা ডাস্টবিন দেখেন।
আঞ্চলিক ভাষায় একটি কথা আছে পাবনায়, (খাবু না তো মাহালু ক্যা? মানে, খাবি না তো মেখে নষ্ট করলি কেন?

বিশ্বাস করুন, আমারও কলিজার ভেতর কঠিন একটা মোচড় দিয়েছিল বুফে থেকে বের হয়ে, যখন অতগুলো অসহায় ক্ষুধার্ত মুখ দেখলাম। কী অদ্ভুত দেশে বাস করছি, কেউ অযথা অকারণ কত দামি দামি খাবার শুধু টাকার জোরে নষ্ট করছে; আর কেউ সামান্য টাকার অভাবে দামি খাবার তো দূরের কথা, এক বেলা ডাল–ভাতও খেতে পারছে না। এই বিরাট ব্যবধান কবে ঘুচবে? কবে আসবে সমতা?

আমার পিছু পিছু ১২–১৩ বছরের একটি ছোট্ট ছেলে ঘুরছিল আর বারবার কটা টাকা চাচ্ছিল। ও তো একা নয়, ওর সঙ্গে আরও অনেকে আমাকে ঘিরে ধরেছিল দুটি টাকার জন্য। আমি জোরে জোরে হাঁটতেই মিষ্টি চেহারার ছোট্ট ছেলেটি বলে উঠল, ‘আপা, আপনারা না দিলে আমরা খামু কী?’

সেই রাত থেকে আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। রোজ রাতে ওই বাচ্চা ছেলেটার কথা কানে বাজে। কিন্তু কী করার ক্ষমতা আছে আমার এই অসমতা নামের অনিয়মের রীতি বদলানোর ক্ষেত্রে? আসুন না, আমরা সবাই একটু সচেতন হই। অপচয় না করি, নষ্ট না করি এত এত খাবার। বরং সেই অপচয় না হওয়া টাকা রাস্তার কোনো এতিম–অসহায় মানুষকে দান করি। পৃথিবীতে অভাব–অনটন শব্দ নদীর পাড়ভাঙনের মতো বিলীন হয়ে যাক।
চাঁদটাকে চাঁদ–ই মনে হোক, ঝলসানো রুটি নয়।

*লেখক: সিনিয়র এক্সিকিউটিভ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন