বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

২৬ মার্চ ইয়াহিয়া তাঁর ব্যক্তিগত আলাপে বলেছিলেন, ‘শেখকে মরতেই হবে।’ বিচার ছাড়াই বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলার কথা তিনি ভাবছিলেন। একাত্তরের জুলাইয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘বাঙালি নেতা পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে সুস্থ ও জীবিত আছেন। তবে আজকের পর কাল তাঁর জীবনে কী ঘটবে, সেটা আমি বলতে পারি না। তাঁর বিচার করা হবে। এর মনে এই না যে কালই তাঁকে গুলি করছি…।’ বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন যে সামরিক একনায়কের খেয়ালখুশির ওপর তাঁর জীবন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি নিহত হওয়ার জন্য তৈরি ছিলাম। একজন মানুষ যখন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকে, তখন তাকে আর কেউ হত্যা করতে পারে না।’ বঙ্গবন্ধু দিনের হিসাব রাখতেন। পবিত্র কোরআন পড়তেন। তাকিয়ে থাকতেন আকাশের দিকে। আর নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন কারাগারের গভীর নীরবতার কাছে। এক ভয়াবহ নিঃশব্দের দীর্ঘ কারাবাসে বুঝেছিলেন মুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ।

বঙ্গবন্ধু বাংলার জনগণের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তাদের ভালোবাসা আমি অনুভব করতে পারি এবং সে ভালোবাসার প্রতিদান আমি দিই। আমি যখন তাদের মধ্যে থাকি, তখন সেটা এক রকম, যখন করাগারে থাকি তখনো তা একই রকম। আমি তাদের তীব্রভাবে ভালোবাসি এবং আমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এটাই যথেষ্ট। তাদের ভালোবাস যদি না থাকত, বহুবার আমার মৃত্যু হতো।’ বঙ্গবন্ধু এটাও মনে করতেন, তাঁর জনগণের বিজয় হবেই। কারণ, এত রক্তদান বৃথা যেতে পারে না।

default-image

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি দেখতে পেতাম, আমার সামনে ঝুলছে ফাঁসির রজ্জু। তবে সময়-সময় একে মনে হতো লাল গোলাপের মালা। ...আমার অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, পাকিস্তানের ধ্বংসস্তূপ থেকে নিশ্চিতভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের উত্থান ঘটবে। বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পর যদি তাদের উন্মত্ত জিঘাংসার শিকার হই, তবে আমার কোনো খেদ থাকবে না। আমার যদি একাধিক জীবন থাকত, সব কটি জীবন যদি বাংলাদেশকে বাস্তব করে তুলতে বিসর্জন দিতে হতো, তাহলেও আমার কোনো খেদ থাকত না। তারা আমাকে মাত্র একবারই হত্যা করবে। আমি জানি, প্রত্যেক মানুষের আছে সেই চূড়ান্ত পরিণতি। তবে আমার প্রার্থনা, জয় বাংলা শব্দ মাধুরীর মধ্যে যেন আমার মৃত্যু হয়।’

বঙ্গবন্ধুকে একবার আজীবন কারাবাস দেওয়া হয়েছিল। তখন তাঁর বয়স ছিল ৪৪। রেয়াত বাদ দিলে থাকে ২০ বছর জেল খাটতে হবে। তাঁর মুক্তির সময় বয়স হবে ৬৪ বছর। তিনি মনে করছেন, তখনো তাঁর শরীরে অনেক শক্তি থাকবে। আবার তিনি জনগণের মুক্তির জন্য কাজ করবেন। পৃথিবীতে এমন মানুষ বিরল, যার রক্ত, মাংস, অস্থি, মজ্জায় শুধু জনগণ আর জনগণ।

তাঁর কবরের ওপর ঘটবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়

ভুট্টো খুব ভালোভাবে জানতেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলে সেটা পাকিস্তানের জন্য বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করবে। এদিকে ইয়াহিয়ার কঠিন প্রতিজ্ঞা, বিচারে বা বিনা বিচারে যেভাবে হোক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবেই। ইয়াহিয়াকে সতর্ক করে ভুট্টো বললেন, তাঁর হাতে নিহত হওয়ার চেয়ে অনেক বড় মাপের মানুষ মুজিব।

একদিন ইয়াহিয়ার অফিসে এলেন ভুট্টো। তিনি একটার পর একটা ফাইলে সই করছেন। অনেক ব্যস্ত। দুপুরে চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে লাঞ্চ। ভুট্টোকে বললেন, তিনি যেন কথা চালিয়ে যান। ভুট্টো বললেন, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমার মনে হয় আমাদের পরস্পরের ভাবনা বিনিময়ের সময় হয়েছে।’ ইয়াহিয়া বললেন, তাঁর কেন এমন মনে হলো। ভুট্টো বললেন, দেশে দুর্গতি চলছে। মজুরি কমেছে। কর বেড়েছে। পূর্ব অংশে সামরিক অভিযান। দেশে-বিদেশে সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থায় দরকার একটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। পূর্ব পাকিস্তানে শান্তি, শেখ মুজিবের মুক্তি। কর কমান। দুর্নীতির অবসান ইত্যাদি। দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান চলছে, যা উচিত ছিল না। ইয়াহিয়া বললেন, ‘মনে রাখবেন জুলফি, আপনি এতে সম্মতি দিয়েছিলেন। আপনিই প্রথম সামরিক অভিযানের প্রস্তাব করেছিলেন। আপনি জানেন, সবকিছুর সঙ্গে আপনি ছিলেন এবং একমত হয়েছিলেন। শেখ মুজিবের মুক্তি ও দেশের দুর্নীতি নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে আসবেন না।’ ভুট্টো বলেন, ‘আল্লার দোহাই, তাঁকে মারবেন না। আপনার হতে নিহত হওয়ার চেয়ে অনেক বড় মাপের মানুষ তিনি।’

ইয়াহিয়া বলেন, ‘আপনি মনে করেন তাঁকে হত্যা করার মতো বড় আমি নই? আমি দুনিয়ার শক্তিমানদের একজন। যারা মনে করে, একজন মুজিবকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো সাহস আমার নেই, তারা আমার অবমূল্যায়ন করে।’

ভুট্টো বললেন, ‘তেমন হলে সারা দুনিয়া আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে; বিশেষ করে আমেরিকা। তারা যত খুশি বাঙালি নিধন করতে দেবে; কিন্তু শেখ মুজিবকে নয়।’ ইয়াহিয়া বলেন, আমেরিকাকে তিনি পকেটে পুরে রাখেন। নিক্সন ও কিসিঞ্জারের সঙ্গে তাঁর যোগযোগ আছে। তাঁরা এটাকে পাকিস্তানের নিজস্ব ব্যাপার মনে করেন এবং সেটাই হতে যাচ্ছে। ভুট্টো ভাবতে থাকেন, মুজিবের শহীদের মৃত্যু হতে যাচ্ছে। তাঁর কবরের ওপর বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটবে। কিন্তু একবার যেহেতু তিনি বেঁচে গেছেন, সেহেতু মৃত্যুদণ্ডের আগে কিছু একটা বিচার করতেই হবে। আর অন্তত সে পর্যন্ত তিনি বেঁচে থাকবেন।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছেন। জনগণকে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করতে বলেছেন। এসবই রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ। এ অপরাধে তাঁকে সাজা পেতে হবে। এর আগের দিন ২ আগস্ট প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের সদর দপ্তর থেকে এক প্রেসনোটে বলা হয়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য বিশেষ সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের বিচার করা হবে। তিনি তাঁর পছন্দের কৌঁসুলি নিতে পারবেন। তবে কৌঁসুলিকে পাকিস্তানের নাগরিক হবে। অন্যান্য সুযোগও তিনি পাবেন। ১১ আগস্ট। লায়ায়পুর কারাগার। লাল ইটের একতলা একটি ভবন। এখানে একটি রুদ্ধদ্বার কক্ষে শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর কথিত প্রহসনের বিচার।

বঙ্গবন্ধুর অপরাধ হলো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা। এই মিথ্যা অভিযোগকে ১২টি অভিযোগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি অভিযোগের জন্যই মৃত্যুদণ্ড। এর কোনো একটি অভিযোগও যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে তাঁকে ফাঁসিতে বা ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে।

তিনি লিখলেন সব মিথ্যা

বঙ্গবন্ধুকে রাখা হয়েছিল লায়ালপুর কারাগারে। এটি পাকিস্তানের শহরগুলো ছেড়ে অনেক দূরের একটি কারাগার। এই কারাগারের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিচারক ও সাক্ষী ছিলেন ইয়াহিয়ার পছন্দের। বঙ্গবন্ধু আত্মপক্ষ সমর্থন করেননি। তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে কথাও বলেননি। কারণ, এ বিচারের রায় ছিল পূর্বনির্ধারিত।

বিচারের সপ্তম দিনে হঠাৎ বঙ্গবন্ধুর সেলে এক ভয়ংকর প্রহরী ঢুকল। তার চেখেমুখে ভীষণ নিষ্ঠুরতার ভাব। তাকে দেখে বঙ্গবন্ধু খানিকটা পিছিয়ে গেলেন। সে তার ময়লা দাঁত বের করে তীক্ষ্ণ চোখে বঙ্গবন্ধুকে দেখছিল। আবার নীরবে বেরিয়ে গেল। বঙ্গবন্ধুকে আদালতে নেওয়া হতো। আদালতকক্ষ পাকিস্তানের পতাকা দিয়ে সাজানো ছিল। তিনি বিচারকাজ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতেন। বিচারের শুরুতে একবার বিচারক জনতে চেয়েছিলেন আত্মপক্ষ সমর্থন করে কিছু বলতে চান কি না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আপনারা যখন আমাকে মেরে ফেলবেন, আমি চাই আমার লাশ যেন বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।’ বঙ্গবন্ধুকে যে উকিল দেওয়া হয়েছিল, তিনি বঙ্গবন্ধুকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য অনুরোধ করেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, আমাকে বা আমার জনগণকে বিচার করার অধিকার এদের নেই। আইনের দিক দিয়ে কোনো বৈধতা এই আদালতের নেই।’ আগস্টের শেষে প্রায় সবাই নিশ্চিত হয়ে গেল আদলতে ইয়াহিয়ার ঠিক করে দেওয়া রায় পাঠ করা হবে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বিচারকাজ চলল। বঙ্গবন্ধুর উকিল মাঝেমধ্যে দেখা করতে আসতেন। কিন্তু তিনি প্রায় কোনো কথা বলতেন না। একবার তাঁকে আদালতের কার্যক্রমের বিবরণী দেওয়া হলো। তিনি লিখলেন, ‘সব মিথ্যা’। আরেকবার লিখলেন, ‘রাষ্ট্রদ্রোহ কাকে বলে? আমরা যে নির্যাতনের শিকার, এটা বলা কি রাষ্ট্রদ্রোহ?’
আগস্টের শেষে বিচারের কাগজ দেখেতে দেখেতে একবার ইয়াহিয়া বলছিলেন, ‘বিচার করা না-করায় কিচ্ছু আসে-যায় না। বন্দীকে (বঙ্গবন্ধু) মিয়ানওয়ালি জেলে পাঠিয়ে দাও।’ সামরিক আইন প্রশাসকের প্রেস নোটে বলা হয়, বিচার শুরু হয়েছে ১১ আগস্ট। শেখ মুজিবের জন্য এ কে ব্রোহি ও তাঁর তিন সহকারী গুলাম আলী মেনন, আকবর মির্জা ও গুলাম হুসেইনের সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়। এ পর্যন্ত ২০ জন সাক্ষীর জেরা সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ট্রেড ইউনিয়নের কর্মী, আইনজীবী, সাংবাদিক, লেখক, ছাত্রনেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের একটি অংশ এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। তারা বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও জনপ্রতিনিধির সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে ইয়াহিয়ার কাছে আবেদন করে।

এ আবেদনে স্বাক্ষর করেছিলেন তেহরিক-ইশতিকলাল নেতা এয়ার মার্শাল আসগর খান, লেনিন শান্তি পুরস্কার বিজয়ী কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, পাকিস্তান সোশ্যালিস্ট পার্টির সভাপতি সি আর আসলাম, ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তানের সাবেক সম্পাদক মাজহার আলী খান, পাকিস্তান ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি সি আর আসলামসহ আরও অনেকে। তাঁদের অভিমত হলো, সংকট মোচনের শ্রেষ্ঠ পন্থা গণতান্ত্রিক সরকার গঠন। রাষ্ট্রদ্রোহের জন্য শেখ মুজিবকে যদি মুক্তি দেওয়া না যায়, তাহলে প্রকাশ্য আদালতে তাঁর ন্যায়বিচার করা হোক। চলবে...

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন