বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ আজ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পার করেছে; সরকারি-বেসরকারি নানা পদক্ষেপের ফলে নারীরা আজ প্রায় সব দিক থেকেই এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি,অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতায় নারীরা দৃষ্টান্তমূলক অবদান রাখলেও আজও নারীর প্রতি সহিংসতা ঘটে হরহামেশা। ‘নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে’ বিশ্বব্যাপী ক্যাম্পেইন, প্রতিবাদ, সমাবেশ, গোলটেবিল বৈঠক, মানববন্ধন কর্মসূচি ইত্যাদি প্রচলিত। বছরের পরে বছর চলে যায়, সময়ের আপন নিয়মে কর্মসূচি পালিত হতে থাকে, তবু একটি বিশেষ শক্তিধর গোষ্ঠী বহাল তবিয়তে তাদের ‘পৌরুষ’ আচরণ প্রতিষ্ঠা করতে থাকে অত্যাধুনিক কায়দায়। শুধু কাগজে-কলমে নয় বরং সারাবিশ্বের মানুষের অস্থিমজ্জায় মিশে আছে একটি নেতিবাচক বিশ্বাস, ‘নারীরা অবহেলিত-নির্যাতিত-বঞ্চিত’ ইত্যাদি! বাস্তবতা যা–ই হোক না কেন, শুধু নারীদের ‘মানুষ’ হিসেবে পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন না করার কারণে এ চিত্রটি স্থায়ীভাবে আটকে আছে। নারীর উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে এই জটটি তাঁদের গতিশীলতাকে কেবল ব্যাহত করছে না; বরং পিছিয়ে দিচ্ছে একটি জাতিকে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বাংলাদেশেও একজন মেয়েকে ‘নারী’ হয়ে ওঠা পর্যন্ত তাঁর চলাফেরা, মতামত প্রকাশ এমনকি যাবতীয় ইচ্ছা-অনিচ্ছার গাইডলাইন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ নারী নির্যাতনের শিকার হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী জনবলের মধ্যে, বিশেষ করে সেবক–সেবিকাদের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি নারী। এ নারীরাই আজকের কোভিড-১৯ এর মহাসংকটে নিজেকে নিয়োজিত করে চলেছেন। অথচ তাঁদের স্বীকৃতি মিলছে না কিছুতেই! নারীর উন্নয়নের কথা বলার পরে জনৈক আলোচক যখন নিজের স্ত্রীর প্রতি শারীরিক তথা পারিবারিক সহিংসতার অনুঘটক হন, তখন বিষয়টি সাংঘর্ষিকই বটে!

বিভিন্ন পত্রিকার তথ্যমতে জানা গেছে, ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোভিড-১৯ এর ভয়াবহতার মধ্যে সারা দেশে প্রায় ৫০০টির বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং পারিবারিক নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটেছে ৮ শতাধিক। এ ছাড়া অপ্রকাশিত ঘটনার সংখ্যাটি কেবল অনুমান করে নিলেই বোঝা যায়। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, অধিকাংশ ধর্ষণ তথা নারী নির্যাতনের অন্যান্য ঘটনা ঘটছে নিকটাত্মীয় ও পরিজন দ্বারা। অর্থাৎ নারীরা কোথাও তেমন নিরাপদ নয় বললেই চলে। কঠোর এ পুরুষতন্ত্রের কুপ্রভাব আর ধর্মীয় অনুশাসনের জাঁতাকলে নারীকে পিষ্ট করা হচ্ছে প্রতিটি মুহূর্তে! অথচ প্রতিটি ধর্মেই নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার আহ্বান জানানো হয়েছে সুস্পষ্টভাবে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর ১৬ দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করেছে। নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবিলা কোনো সহজ কাজ নয়! যেহেতু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষেরা প্রায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, তাই সবচেয়ে আগে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় পুরুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে। পরিবারে, বিদ্যালয়ে, কর্মস্থলে, শহরে, বন্দরে, যানবাহনে, এমনকি বিভিন্ন সেবাপ্রতিষ্ঠানে তাঁদের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন খুবই জরুরি। নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর একজন নারীর প্রয়োজনীয় আইনি ও চিকিৎসা সহায়তার সুযোগ পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে নারী–পুরুষের যে ন্যায্য অধিকার ও গুরুত্ব রয়েছে; উভয়ে মিলে যে অভিন্ন সত্তা, এ মানবতাবোধটুকু সমাজ গভীরভাবে উপলব্ধি করতে না পারলে নারীর প্রতি বৈষম্য চলতেই থাকবে। আর এ কাজগুলো শুরু করতে হবে একেবারে গোড়া থেকে, পরিবার থেকে। তাই আসুন সবাই সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। নিজ নিজ জায়গা থেকে সোচ্চার হয়ে প্রতিরোধ করি নারী নির্যাতন। ওপরের করণীয়গুলো নিতান্তই মানব জাতির! নারী জাতিকে ‘মানুষ’ হিসেবে যোগ্য সম্মান দেওয়ার জন্য দায়িত্ব ও কর্তব্য আমাদের সবার, বিশেষ করে পুরুষ জাতির।

সংগত কারণেই লোকলজ্জার ভয়ে ‘নারী জাতি’ আজ বড্ড একা, যা তারা কোনো নিকট–বন্ধুকেও জানাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না! নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নারীদের বিভিন্ন ঐক্যজোট রয়েছে, টকশোতে আলোচনার ঝড় ওঠে, অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেই নির্যাতিত নারীরা লুকিয়ে-লুকিয়ে, ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদে আড়ালে–আবডালে! এহেন অনিয়ম, অন্যায়, অনাচার ও বৈষম্য দূরীকরণে সবার ঐকমত৵ ও সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন। তাই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি—আসুন, জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-বর্ণনির্বিশেষে জেন্ডার সহিংসতা নির্মূল করতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রত্যেকে জেন্ডার সংবেদনশীল হই।

লেখক: মো. তানজিমুল ইসলাম, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন