default-image

রিকশাওয়ালার কি অনেক টাকা জমানো থাকে, নাকি বিশাল অঙ্কের ব্যাংক ব্যালান্স থাকে, কোনটা? যে লোকটা বুট পলিশ করেন, তাঁরই-বা রোজকার আয় ছাড়া কী থাকে জমানো? আর যে মানুষটা গলায় গামছা ঝুলিয়ে পেটের ওপর মস্ত বড় একটা বেতের ধামা বেঁধে বাদাম বিক্রি করে দিন শেষে চাল, ডাল, নুন, তেল নিয়ে বাড়ি ফেরেন, তাঁর কী থাকে? খুব বেশি হলে একটা ৩০ টাকা দামের মাটির ব্যাংক। বছর শেষে সেটা ভেঙে ছেলেমেয়ের জন্য হয়তো দুটো প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারেন এর বেশি কিছু নয়। যাঁরা অন্যের বাড়ি ছুটা বুয়ার কাজ করেন, তাঁদের আমি খুব কাছ থেকে রোজ দেখেছি লোকাল বাসে চড়ার সুবাদে। তাঁদের গা থেকে ঘাম আর আদা-রসুনের গন্ধ বের হতো, কিন্তু আমি নাকে কাপড় দিতাম না যদি তাঁরা কষ্ট পান এই ভেবে। এখন আমি ঘরে বসে অলস সময়ে সেসব আদা-রসুনের গন্ধ পাই, ঘামে ভেজা শরীরগুলো নিশ্চয়ই এই লকডাউনে কাজ হারানোর অভাবে আজ শুকনো খটখটে হয়ে গেছে।

অধিকাংশ বড়লোকেরা করোনার ভয়ে নিজেরাই বাড়ির কাজ করছেন। ছুটিয়ে দিয়েছেন সেই ছুটা বুয়া-খালাদের। কী খেয়ে জীবন যাপন করছেন ওই বুয়া-খালারা? জমানো বলে কিছু আছে তাঁদের—এমনটা আমার মনে হওয়া তো দূরের কথা, বিশ্বাসই হয় না। কিন্তু তাঁরা যেহেতু এবাড়ি-ওবাড়ি কাজ করে বেড়ান, তাই তাঁদের কাছ থেকে করোনা হওয়ার ঝুঁকিটা অনেক বেশি। যদিও এখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাতাসেও করোনা ছড়াচ্ছে, এমনকি নিজের ঘর থেকেও হতে পারে। তার মানে বিপদ আপনি চাইলেও এড়াতে পারছেন না; যতই কাজের বুয়া এবং ড্রাইভার-দারোয়ান ছাঁটাই করেন না কেন!

একজন রিকশাচালক রাস্তায় বের না হয়ে কী করবে বলুন? গতবার লকডাউনে সরকার ত্রাণ দিয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে দেখেওছি যদিও সেসব ত্রাণের সব অংশ যাঁদের জন্য, তাঁরা পাননি। কিন্তু এবার কিছু ব্যক্তিগত সংস্থা ছাড়া সেভাবে সরকারকে উদ্যোগ নিতে দেখিনি। তারপর চলছে পবিত্র রমজান মাস। লাগামহীন দাম জিনিসপত্রের। তাহলে নিম্ন আয়ের এসব লোক কোথায় যাবে, কী খাবে? হ্যাঁ, জীবনের ঝুঁকি আছে বলেই এবং মৃত্যু নিশ্চিত বলেই সরকার লকডাউন দিতে বাধ্য হয়েছে, কিন্তু পেটের ভাত এবং ক্ষুধা কখনো কখনো মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ঘরে সন্তান যখন ক্ষুধায় ক্লান্ত হয়ে পড়ে থাকে, তখন কোনো বাবাই চুপ ঘরে বসে থাকতে পারেন না। তাই যদি একজন প্যাসেঞ্জারও পাওয়া যায়, সে আশা নিয়েই তাঁরা ঘর থেকে বের হন অথচ ঘরে ফিরতে হয় শূন্য হাতে। কারণ, প্রশাসন কঠিন হস্তে দমন করছে লকডাউনের নিয়মভঙ্গকারীদের, তার মধ্যে রিকশাওয়ালারও আছেন কয়েকজন। রোজই চোখে পড়ছে চাকা উলটানো রিকশা আর অসহায় রিকশাওয়ালার চোখের পানি।

এর সমাধান কী? আজ একজন প্রথম আলোয় বলেছেন, সবকিছু থেমে থাকলেও পেট তো থেমে নেই। চরম বাস্তবতা এটা। যাদের ঘরে ছয় মাসের ধান, চাল, তেল, নুন মজুত আছে কিংবা আছে একটা সরকারি চাকরি অথবা রেমিট্যান্সের টাকা, তাঁরা অনেকেই লকডাউনের পক্ষে। আমরা সাধারণ মানুষও চাইছি আগে জীবন তো ইতিহাসে বাঁচুক। রোজ ১০০ বা এর কম জনের মৃত্যু—আহ! এ কি সহ্য করার মতো! কবর খুঁড়তে খুঁড়তে ক্লান্ত কবর খননকারীরা। পৃথিবীর এই প্রথম বাংলাদেশ দেখল কোদাল নয়, মেশিনের সাহায্যে কবর খনন করা। আগাম কেটে রাখা হচ্ছে সারি সারি কবর। এমন দিন কে কবে দেখবে বলে দুঃস্বপ্ন দেখেছিল?

সরকার অভয় দিল ভয় পাবেন না, পাশে আছি। আমরা আশান্বিত হলাম। কিন্তু কষ্ট লাগে রোজ এভাবে উল্টানো রিকশার চাকা আর নিরীহ মানুষের চোখের পানি দেখতে। অনেকেই প্রতিবাদ করছেন, চার চাকার গাড়ি কেন উল্টানো হচ্ছে না? কেন গরিবদের বারবার হতে হয় হয়রানির শিকার? এরা কি তবে শুধুই জনগণ, দেশের নাগরিক নয়? নাগরিক হয়ে উঠতে গেলে তবে কী লাগে?

জীবন না জীবিকা—এই প্রশ্ন আজ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত সবার মুখে মুখে। দেশে দু-দুবার করোনা আঘাত হানল। গতবারের করোনাপরবর্তী জরিপে দেখেছি, দেশে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। এবারও নিশ্চয়ই এর ব্যতিক্রম হবে না। কিন্তু এত এত অর্থবিত্ত দিয়ে কী করবেন তাঁরা? এমন অনেক কোটিপতি আছেন, যাঁদের হাজার কোটি টাকা ব্যাংকে লোন কিন্তু পরিশোধের নাম নেই। ক্ষমতার দাপটে সরকারও তাঁদের কাছে কাবু। অথচ সেই মালিকেরা মাসের পর মাস তাঁদের কর্মীদের বেতনবিহীন কাজ করাচ্ছেন। এ করোনাও তাঁদের বিবেকের চোখ টেনে খুলতে ব্যর্থ। শ্রমিকের ন্যায্য মূল্যে না দিয়ে সেই টাকা দিয়ে তাঁরা কন্সট্রাকশন বানাচ্ছেন, বিদেশে সেকেন্ড হোম বানাচ্ছেন। কী নিষ্ঠুর মানবতা! অথচ তাঁরই কর্মী মাস শেষে সন্তানের জন্য একটু ভালো বাজার করে বাড়ি ফিরতে পারছেন না।

বিজ্ঞাপন

এবার একটু পথশিশুদের কথা বলি। সেদিন অনলাইন নিউজে দেখলাম, মিম আর শিউলি নামের দুই কিশোরী পথের ডিভাইডারে শুয়ে আছে। মা কাজ করে ফিরবেন বলে আর ফেরেনি? লকডাউন হওয়ায় ওরা ঘরেও ফিরতে পারছে না। তাহলে এই দুটো বাচ্চা মেয়ের নিরাপত্তা কোথায়? মিম বলেছিল, ‘আমরা ভিক্ষা করিনা ভাইয়া, আমরা ফুল বিক্রি করি, কিন্তু খিদার জ্বালায় আজ ছোট বোনডা হাত পাতছে।’ আহারে এমন হাজারো পথশিশু আজ বেকার। তাদের কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ বেলুন বেঁচে, কেউবা পানি বিক্রি করে ট্রাফিক জ্যামে ঘুরে ঘুরে। এত এত অসহায় মুখে আজ তালা।
আমরা বাঁচতে চাই। বাঁচতে চাই যেমন করোনা নামক দানবের হাত থেকে, তেমনি বাঁচতে চাই ক্ষুধার মতো কঠিন বাস্তবতার হাত থেকেও। আমরা যে যতটুকু পারি, তা–ই দিয়ে সাহায্য করি এসব নিম্ন আয়ের মানুষকে। মানুষ আমরা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। তাই একমাত্র ওপরওয়ালাই পারেন আমাদের এই কঠিন বিপদ থেকে উদ্ধার করতে। খারাপ সময় ভালো কিছুর বার্তা নিয়ে আসে। আসুন আমরা আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে প্রার্থনা করি। ফিরে যাই ফেলে আসা সেই অনিন্দ্য সবুজ-সুন্দর সময়ে।

*লেখক: রোজিনা রাখী, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন