বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এ কথার সূত্র ধরে অনেকে অনেক মন্তব্য করেছেন। বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে নানা বিশ্লেষণ করছেন। আসলে কেনই-বা অনেকে ঘটনাচক্রে শিক্ষক হচ্ছেন, সেটার গভীরে পৌঁছানো জরুরি। জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে গিয়ে খুব বেশি মানুষ পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নেন না। যোগ্যতা বা পরিবারের স্বপ্ন থাকা ছাড়াও এর বিভিন্ন কারণ রয়েছে। আমার দৃষ্টিতে এসবের মধ্যে প্রথম যে কারণটি সেটা হলো, শিক্ষকতার উপযুক্ত মর্যাদা ও সম্মানীর ঘাটতি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব। একজন মানুষের যখন লক্ষ্য নির্ধারণের সময় আসে, তখন তিনি অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে উন্নত সুবিধাসম্পন্ন জীবনমানের কথা চিন্তা করেন। চিন্তা করেন কোন পেশায় গেলে তিনি তাঁর জীবনকে অনায়াসে সুন্দরভাবে চালিয়ে নিতে পারবেন। কারণ, বাস্তব জীবনে স্বাভাবিক এবং কোনো ধরনের চাপ ছাড়া চলতে গেলে আর্থিক ও উপযুক্ত মর্যাদার বিষয়টি মাথায় রাখতে হয়। কেবল সম্মান নিয়ে পেশা ধরে রাখতে চাইলে জীবনে কষ্ট নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক সম্মানিত শিক্ষককে দেখেছি, জীবনে আর্থিক কষ্টে পড়ে তাঁদের কী দুর্দশাই না হয়েছে! আমাদের প্রিয় শিক্ষকেরা কেন এমন কষ্টে থাকবেন? এখন তো দেশ অনেক এগিয়েছে। এখন তো শিক্ষকদের উপযুক্ত মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধাদি দেওয়া সম্ভব। শিক্ষকদের শুধু জাতির কারিগর বলে তাঁদের পর্যাপ্ত আর্থিক সুবিধা/বেতন স্কেল থেকে বঞ্চিত করার কোনো কারণ নেই। এসব ভাবার সময় এসেছে।

ঘটনাচক্রে শিক্ষক হওয়ার ক্ষেত্রে আরও একটি কারণ, চাকরিপ্রার্থীর বিপরীতে পদসংখ্যার অপ্রতুলতা এবং যোগ্যতার চেয়ে লবিং ক্ষমতার দাপট। উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এসব কারণে অন্য কোনো উপায় না দেখে শিক্ষকতার দিকেই ছুটেন তাঁরা। এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।

এখানে জাতীয় অধ্যাপক যিনি হবেন, তাঁর স্থান ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের তালিকার ১৭ নম্বরে। সিনিয়র অধ্যাপকের অবস্থান হলো ১৯ নম্বরে। আর প্রাথমিকের শিক্ষকেরা তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী! বেতন ও আর্থিক সুবিধাদিও মর্যাদা অনুযায়ী পাচ্ছেন তাঁরা। এই বৈষম্য এখন সৃষ্টি হয়নি। যুগ যুগ ধরে এভাবেই চলে আসছে। এ নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা আছে বলেও মনে হয় না। শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখনো সেটা আলোর মুখ দেখেনি। এ বৈষম্য কিংবা তফাত দেখলে শিক্ষকতা পেশার দিকে কেউ পা বাড়াতে চাইবেন না। হয়তো শেষমেশ ঘটনাচক্রেই শিক্ষক হবেন!

ঘটনাচক্রে না হয়ে জীবনের লক্ষ্যই শিক্ষক হওয়া যেন সবার থাকে, সে জন্য উপযুক্ত মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। মুখে শুধু শিক্ষকদের সম্মান দেওয়ার কথা বলে ফেনা তুললে হবে না। আমরাও চাই, কেউ ঘটনাচক্রে শিক্ষক না হোন। সবাই পেশা হিসেবে, জীবনের লক্ষ্য হিসেবে শিক্ষকতাকেই বেছে নিন। এ জন্য দৃষ্টি আকর্ষণমূলক, প্রয়োজনীয় আর্থিক সুবিধা (উচ্চতর বেতন স্কেলসহ) দিতে হবে। বৈষম্য রোধ করে দিতে হবে শিক্ষকদের প্রাপ্য মর্যাদা। এমন ব্যবস্থা হোক, যেন সবাই ঘটনাচক্রে না হয়ে স্বেচ্ছায় শিক্ষকতা পেশার দিকে ছুটে আসতে চান। তা ছাড়া একই ডিপার্টমেন্টে প্রমোশনে ধীর গতি কিংবা প্রমোশনই না থাকা ইত্যাদি বৈষম্য তো রয়েছে। এসব দেখে কেউ কি শিক্ষকতা পেশায় আসতে চাইবেন? হ্যাঁ, বর্তমানে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা, বেতন বাড়ানো হয়েছে আগের চেয়ে বেশি, কিন্তু তা-ও সরকারি উচ্চপদের অপরাপর পদের চেয়ে কম। এখন যেহেতু ‘ঘটনাচক্র শিক্ষক’-এর বিষয় আলোচনায় এসেছে, সেহেতু সব ধরনের বৈষম্য নিরসন করে ‘ঘটনাচক্রে’ না হয়ে সরাসরি শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হোক।

লেখক: শিক্ষক। চট্টগ্রাম [email protected]

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন