বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

উন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে ঠিকই, কিন্তু আমরাও কি কম যাচ্ছি? গাছ কেটে সাবাড় করছি একের পর এক অঞ্চল। গেল এক-দুই মাসে আগারগাঁও এলাকায় যত গাছ কাটা হয়েছে, তার ক্ষতি কী করে পুষিয়ে নেব আমরা! অন্যদিকে মেট্রোরেলের জন্য গেল কয়েক বছরে গাছ কাটা না হয় বাদই দিলাম, পুরো ঢাকা হয়ে পড়েছে দূষণের নগরী। ধুলাবালুতে ভরপুর রাজধানীর প্রতিটি অলিগলি ও সেখানকার বাতাস। কী লাভ হচ্ছে কৃত্রিম উন্নয়নের পেছনে অর্থ ঢেলে সাধারণ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে! ঢাকাই শুধু নয়, ধীরে ধীরে দূষিত হয়ে যাচ্ছে পুরো বাংলাদেশ। আমাদের কমছে সহ্যক্ষমতাও, পরিবেশ তার শোধ ঠিকই কড়ায়গণ্ডায় মিটিয়ে নিচ্ছে, মিটিয়ে নেবে। নতুন প্রজন্মের জন্য বিষাক্ত এক মাটি, পানি, বায়ু তৈরি করছি আমরা।

আবারও ফিরি হাতির মৃত্যু প্রসঙ্গে। কক্সবাজারে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার জন্য, তাদের ক্যাম্পের কারণে হাতির আবাস নষ্ট হয়েছে। আজ হাতি বিপন্ন হয়ে উঠেছে। শুধু হাতি নয়, অন্যান্য প্রাণীও। ২০১৬ সালের এক সমীক্ষামতে, বৃহত্তর চট্টগ্রামে হাতির চলাচলের ১১টি করিডর ছিল। এর বেশির ভাগ কার্যত বন্ধ। শেরপুর, জামালপুর-ময়মনসিংহেরও একই অবস্থা, সেখানে ফসল রক্ষায় মারা পড়ছে হাতি। আবাসস্থল ধ্বংস, মানুষের সঙ্গে সংঘাত বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে একের পর এক হাতির মৃত্যু শিরোনাম হচ্ছে সংবাদের। এতে দেশে প্রাণীটির অস্তিত্ব নিয়েই বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন।

বন্য প্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের তথ্য বলছে, ২০০৪ সালের জরিপে চট্টগ্রাম অঞ্চলে হাতির সংখ্যা ছিল ২২৭। এখন গোটা দেশেই হাতি মাত্র ৩০০টি অবশিষ্ট। ভারত থেকে মাঝেমধ্যে আসা হাতিসহ দেশে হাতির সংখ্যা প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০-এর মতো। সংস্থাটির সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, শেরপুরের বনাঞ্চলে বিচরণকারী হাতির সংখ্যা মাত্র ১২০ থেকে ১২৫। দেশে গত ২৫ বছরে হত্যার শিকার হয়েছে ১৫০টির বেশি হাতি। কিন্তু নেই কোনো বিচার, নেই কোনো জবাবদিহি।

হাতির জন্য কৃষকের ফসলের কোনো ক্ষতি হলে সরকার দ্বিগুণ মূল্য পরিশোধ করে, এটাই রয়েছে আইনে। কিন্তু মানুষ যেমন অস্থির প্রকৃতির তেমনি প্রশাসনও উদাস। এতে আইন থেকে যাচ্ছে কাগজে-কলমে, মাঝখান থেকে প্রাণ হারাচ্ছে হাতি। প্রাণীটি হত্যায় যে কটি মামলা হয়েছে, তা ঝুলে আছে। এটি যে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়, তা-ই মনে করে না কেউ! হাতি জনপদে নেমে এলে আগে পটকা ফুটিয়ে, মশাল জ্বেলে বা টিন পিটিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হতো, কিন্তু কয়েক বছর ধরে বৈদ্যুতিক ফাঁদের প্রবণতা বেড়েছে। না বুঝে বিদ্যুতায়িত বেড়ার সংস্পর্শে এসে মারা পড়ছে বিশাল আকারের একেকটি হাতি।

কদিন আগে কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার এক মাছের ঘেরের পাশে বাচ্চা হাতিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। আগের রাতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তার করুণ মৃত্যু হয়েছে বলে ময়নাতদন্তকারী কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। লোহার বল্লম গরম করে হাতির শরীরে ছুড়ে মারা হচ্ছে প্রায়ই। চোরাশিকারিরা দাঁতসহ দেহাংশের লোভেও প্রাণীটিকে হত্যা করছেন। হত্যাসহ অস্বাভাবিক মৃত্যু অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশের বনাঞ্চল থেকে এশীয় প্রজাতির হাতি বিলীন হওয়ারই শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ, প্রজাতিটি ১৯৮৬ সাল থেকেই লাল তালিকায় রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন হাতি শুধু দেখা যাবে চিড়িয়াখানায়। হাতি হত্যার এ গতি অব্যাহত থাকলে তেমন দিন দেখতে আর বছর দশেকও লাগবে না। শুধু হাতি কেন, সুন্দরবনে বাঘ হত্যাও থেমে নেই। সব মিলিয়ে আগামী দিনে শুধুই মানুষে মানুষে গিজগিজ করবে দেশ। থাকবে না কোনো প্রাণী আর! সে বন্দোবস্তই চলমান।
*লেখক: সৈয়দ ইফতেখার, টেলিভিশন সাংবাদিক

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন