default-image

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় এবারের লকডাউন–পরিকল্পনা অবশ্যই ভালো হয়েছে। ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া লকডাউনের জন্য যে ধরনের গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে, তা অবশ্যই আমার কাছে ঠিক মনে হয়েছে। একটি কার্যকর লকডাউন গাইডলাইন এ রকমই হওয়া উচিত।

বাংলাদেশে লকডাউন কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব?

আমি আগেও বলেছি বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য লকডাউন খুবই কঠিন। এ দেশে বাস করে ১৭ কোটির মতো মানুষ। জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। সে ক্ষেত্রে যদি সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত কাঁচাবাজার খোলা থাকে, তবে বাসার বাইরে বিরাট জনসমাগম হওয়া খুবই স্বাভাবিক। দেশের আয়তন যদি আমেরিকার সমান হতো, তবে আমাদের মনে হতো না যে অনেক মানুষ বাইরে চলাফেরা করছে।

আবার জনসংখ্যার ঘনত্ব শহর আর গ্রামে সমান নয়। গ্রামের আয়তন শহরের চেয়ে বেশি। কিন্তু শহরে জনসংখ্যার ঘনত্ব গ্রামের চেয়ে বেশি। আমরা জানি, করোনাভাইরাস ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। সামাজিক দূরত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা যায় গ্রামের দিকে তাকালে। করোনাভাইরাসের ভিকটিম গ্রামে অনেক কম। কিন্তু শহরে সেই তুলনায় অনেক বেশি। এর কারণে গ্রামের মানুষের কাছে করোনা এখনো মিথ। তারা বিশ্বাসই করে না করোনা বলে কিছু আছে। সংগত কারণেই গ্রামের মানুষ লকডাউন মানতে চাইবে না।

গ্রামের দিকে যেহেতু করোনাভাইরাসের আক্রমণ কম, সেহেতু লকডাউন বাস্তবায়নকারী সংস্থার উচিত গ্রামকে শহরের মতো না দেখা। সেখানে খেতখামার থেকে শুরু করে বাজারে লোকজন যাবেই। তারা যেহেতু করোনাভাইরাসকে একটা মিথ মনে করে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচিত গ্রামের ব্যাপারগুলো খুব সহজভাবে দেখা।

default-image

বাংলাদেশের জন্য আসলেই লকডাউন উপযোগী কি না?

যখন কোনো একটি সংক্রামক রোগে হাসপাতাল অকুপেন্সি বেড়ে যায় এবং তা সম্পূর্ণরূপে সেচুরেটেড হয়ে যায়, তখন ওই রোগ থেকে বাঁচতে হলে লকডাউনের চেয়ে ভালো উপায় নেই। তাই প্রতিটি দেশ করোনার সময় লকডাউন করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে এই লকডাউন অবশ্যই কঠিন। এর অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হলো আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা। আমরা যেহেতু মানুষকে ঘরে বসিয়ে খাওয়ায় পারব না, সেহেতু একটা বিরাট জনগোষ্ঠী ক্ষুধা সমস্যায় পড়বে। তাদের ঘরের মধ্যে আটকে রাখা তাই কঠিন হবে।

বিজ্ঞাপন

ইতিমধ্যে কথা উঠেছে শিল্পকারখানা খোলা কেন? আগেই বলেছি আমাদের অর্থনীতি মোটেই সেই পরিমাণ মজবুত নয়। অর্থনীতি ঠিক রাখতে এবং সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষগুলোর খাবার সরবরাহ অব্যাহত রাখতে এর চেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারে? তা ছাড়া কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে খাবারের দোকানের ব্যবসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা করে থাকেন। এগুলো খোলা রাখাও তাই ভালো হয়েছে। এখানে একটা বিরাট সংখ্যার মানুষ উপকৃত হবে। কাঁচাবাজার খোলা রাখায় গ্রামের কৃষিপণ্য বিক্রি করেও মানুষ খাবার সংস্থান করতে পারবে। তাই গ্রামের মানুষের কোনো সমস্যা হবে না।

তবে লকডাউনে কিছু মানুষের আর্থিক অবস্থা নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। আমার দৃষ্টিতে খারাপ অবস্থা হবে প্রাইভেট চাকরিজীবী মানুষের। বেসরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সব মাঝারি প্রাইভেট চাকরিজীবী মানুষের অবস্থা সবচেয়ে বেশি নাজুক হচ্ছে। পেট চালাতে পারবে না রিকশাচালক থেকে শুরু করে বস্তিবাসী। তাদের কথা সরকারকে অবশ্যই ভাবতে হবে। তা না হলে তারা রাস্তায় বের হয়ে গেলে অবাক হব না। শহরের দিনমজুর মানুষের খাবারের ব্যবস্থা সরকারকে করতেই হবে।

পরিশেষে বলব, করোনাভাইরাস মোকাবিলা এখন বিশ্বের কাছে একটা যুদ্ধের মতো। এই যুদ্ধে কিছু সাময়িক অসুবিধা হবে, এটাই স্বাভাবিক। কষ্ট হলেও এই অসুবিধাটুকু আমাদের মেনে নিতে হবে।

লেখক: ড. মো. ফজলুল করিম, সহযোগী অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল, বাংলাদেশ। ভূতপূর্ব ফ্যাকাল্টি, কুমামতো বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান এবং পোস্টডক্টরাল ফেলো, পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন