বিজ্ঞাপন

করোনায় এক বছরের বেশি সময় ধরে সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে। গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ছুটি দফায় দফায় বেড়েছে। কবে নাগাদ এ ছুটির অবসান ঘটবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ লম্বা ছুটিতে নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় বাড়ি হিসেবে পরিচিত আবাসিক হলগুলো এখন পাখিদের আস্তানা। তাদের পড়ার টেবিলে এখন ধুলোর আস্তরণ। সর্বদা শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখরিত থাকা ক্যাম্পাসগুলো যৌবন হারাতে বসেছে। পয়লা বৈশাখে বাঙালি ঐতিহ্যে সুসজ্জিত হয়ে সবাই মিলে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও শোভাযাত্রা করে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেওয়া; গ্রীষ্মে গাছভর্তি কৃষ্ণচূড়ার সৌন্দর্যে বিমোহিত হওয়া এবং ক্যাম্পাসের বাহারি রকমের সুস্বাদু ফলগুলোয় নিজেদের ভাগ বসানো; মন খারাপের রাতগুলোয় কাছের বন্ধুকে সঙ্গে করে পুরো ক্যাম্পাস টহল দিতে দিতে গল্প করা; বর্ষায় ভিজে কদম পাড়া ও বকুল কুড়ানো; ক্লাস শেষে দৌড়ে গিয়ে লাল ডাবল ডেকার বাস ধরা এবং যাত্রাকালে গান-বাজনায় মুখরিত থাকা; শরতে বিস্তৃত মাঠের কাশবনে শুয়ে নীল আকাশ ও শুভ্র মেঘের সৌন্দর্য উপভোগ করা; লেকের পাড়ে বন্ধুর জন্মদিন শেষে হাসি-তামাশায় ফেটে পড়া; হেমন্তে শিশিরভেজা শিউলি–কামিনীতে মাতাল হওয়া; শীতের সকালে চাদর গায়ে দল বেঁধে খেজুরের রস খেতে যাওয়া; ঋতুর রানি বসন্তে নানা ধরনের-রঙের-গন্ধের ফুলে নিজেকেই হারিয়ে ফেলা—এসবই যেন এখন স্মৃতি। ক্লাসরুমে আজ নেই কোনো কোলাহল। সহপাঠী ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয় না আজ কত দিন! হয় না আর তাদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠা। মামার টং দোকানে পোড়া রুটি দিয়ে ডাবল হিটের দুধ–চায়ের টেস্ট নেওয়া হয় না সেই কবে থেকে। বন্ধুদের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে উঠতে হৃদয় আজ ডুকরে মরে। পিতৃতুল্য ও বন্ধুসুলভ শিক্ষকদের ক্লাসগুলো আজ বড্ড মিস করি। বারবার মনে পড়ে যায় তাঁদের মধুর শাসন-বারণের কথা। তাঁদের স্নেহ-ভালোবাসার অনুপস্থিতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে দৃশ্যমান। তাঁদের উপদেশ ও দিকনির্দেশনার অভাবে খেই হারাতে বসেছে ছাত্রসমাজ। সর্বোপরি শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।

একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রাখার পর থেকেই তার ওপর পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষা শতগুণ বেড়ে যায়। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে তার দায়িত্ববোধ। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মানসিকতা জন্ম নেয় তার ভেতরে। এই লক্ষ্যে সে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনসহ বিভিন্ন খণ্ডকালীন পেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

মহামারির কারণে টানা চার মাস শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি পড়াশোনার বাইরে থাকার পর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সিদ্ধান্ত মোতাবেক গত বছরের জুলাই মাস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন ক্লাস নেওয়া শুরু করে। কিন্তু সেখানেও ঘটে বিপত্তি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় অংশই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা। অনলাইন ক্লাসে যোগদানের জন্য প্রয়োজনীয় ডিভাইস সমস্যাসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে ধীরগতির ইন্টারনেট সেবার কারণে অনেক শিক্ষার্থী এ ব্যবস্থার বাইরে রয়ে যায়। এ ছাড়া অনলাইন ক্লাসের সঙ্গে পূর্বপরিচয় না থাকা এবং সুচারুরূপে ক্লাস পরিচালনায় শিক্ষকদের দক্ষতার অভাবেও শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় বর্তমানে মাসে যে গুটিকয় ক্লাস হয়, তা থেকে শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, সে প্রশ্ন থেকে যায়। পরিশেষে, এখানেও শিক্ষার্থীদের অসহায়ত্বই ভেসে ওঠে।

default-image

একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রাখার পর থেকেই তার ওপর পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষা শতগুণ বেড়ে যায়। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে তার দায়িত্ববোধ। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মানসিকতা জন্ম নেয় তার ভেতরে। এই লক্ষ্যে সে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনসহ বিভিন্ন খণ্ডকালীন পেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে তার আয়ের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সে না পারছে নিজের খরচ নিজে চালাতে; আবার সংকোচ ও পরিবারের আর্থিক দৈন্যদশার কারণে না পারছে পরিবারের ওপর ভর করতে। এই অনুভূতিগুলো তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে পড়াশোনা, চাকরির পরীক্ষা ও নিয়োগ থেমে থাকলেও থেমে নেই বয়স। এ বছরের শুরুতেই বিশেষ ব্যবস্থায় অনার্স ফাইনাল ইয়ার এবং মাস্টার্সের পরীক্ষা শুরু হলেও হুট করেই তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরীক্ষার্থীরা পুনরায় অনিশ্চয়তায় পতিত হয়। এরই মধ্যে অনেক চাকরিপ্রত্যাশীর বয়স ৩০ ছুঁই ছুঁই, আবার অনেকের ৩০–এর কোটা অতিক্রম হয়ে গেছে। এ অবস্থায় যুবকেরা তলিয়ে যাচ্ছেন হতাশার সাগরে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে নিচ্ছেন ঝুঁকিপূর্ণ ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

সাম্প্রতিক এক তথ্যমতে ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী চায় ক্লাসে ফিরতে। ৭৬ শতাংশ অভিভাবক এবং ৭৩ শতাংশ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাও চায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হোক। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। তাই যদি এ মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আগেই শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে এ জাতির সোজা হয়ে দাঁড়াতে অনেক সময় লেগে যাবে। শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের সুনাম রয়েছে। কিন্তু শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে এ বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। তাঁরা ধারণা করছেন, করোনার কারণে সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে দ্রুত কর্মপরিকল্পনা এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন অতীব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একজন শিক্ষার্থীর দেখভালের দায়দায়িত্ব তার পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। পরিবার একজন মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে পরিবারেই আমরা অবলম্বন খুঁজি। তাই শিক্ষার্থীদের এই দুঃসময়ে মনোবল টিকিয়ে রাখতে পরিবারকেই প্রধান ভূমিকায় আসীন হতে হবে। তাদের মনের অবস্থার খোঁজ নিতে হবে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে তাদের জন্য আলাদা সময় বের করে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উপায়ে বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনোমতেই যেন তারা নিজেদের বোঝা মনে না করে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

পরিবারের পরেই একজন ব্যক্তির জীবন গঠনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে সমাজ। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবনযাত্রা, চালচলন ও আচার-ব্যবহার তার চরিত্র এবং মানসিকতা গঠনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। তাই ঘরে আগুন লাগলে প্রতিবেশীরা যেমন সবার আগে নেভাতে ছুটে আাসে, তেমনই মহামারির এই ভীতিপূর্ণ সময়ে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো উচিত। সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের কোনো উন্নয়নমূলক কাজে লাগিয়ে তাদের এই একঘেয়েমিপূর্ণ সময়ের সদ্ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে তাদের মন ভালো থাকবে। এ ছাড়া ছাত্রছাত্রীরা কী করছে এবং কীভাবে এই লকডাউন অতিবাহিত করছে, সে বিষয়ে সন্ধান রাখা ও তাদের গঠনমূলক পরামর্শ দেওয়া প্রত্যেক শিক্ষকের পেশাগত ও সামাজিক দায়িত্ব।

যে পথে বর্তমান শিক্ষার চাকা ঘূর্ণমান, তা তমসাচ্ছন্ন। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে সরকারের সদিচ্ছা জরুরি। পৃথিবী থেকে করোনাভাইরাস খুব শিগগির আকস্মিকভাবে বিদায় নেবে—এ রকম ভাবলে সেটা হবে সবচেয়ে বড় বোকামি। আমাদের এই ভাইরাস থেকে বাঁচতে অভিযোজন শিখতে হবে। সরকারের কর্তব্য হবে সব নাগরিকে জন্য এই সংক্রামক প্রতিরোধে কার্যকর টিকা সুনিশ্চিত করা। এর জন্য আন্তরিকতার সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যেতে হবে। নাগরিকদের উচিত হবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মোতাবেক জীবনাচরণে পরিবর্তন আনা। শিক্ষার্থীদের ভরাডুবি রুখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। করোনার সঙ্গে লম্বা সময় ধরে মোকাবিলার কারণে এখন অধিকাংশ শিক্ষার্থী স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্যাম্পাসে প্রত্যাবর্তনে আগ্রহী। সুতরাং শিক্ষা, শিক্ষার্থী এবং জাতিকে বাঁচাতে অনতিবিলম্বে পরিকল্পনামাফিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

**লেখক: মো. রাসেল মিয়া, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন