default-image

বাংলাদেশের এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক স্কুলগুলোর সঙ্গে সরকারি স্কুলের গুণগত মানের পার্থক্য অনেক বেশি। নানা কারণের মধ্যে ভালো শিক্ষকের অভাব এর মধ্যে অন্যতম। এমপিওভুক্ত স্কুলগুলোতে ভালো শিক্ষক না পাওয়ার জন্য কম বেতন-ভাতা দায়ী, আমি তেমনটা মনে করছি না। নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে আসলে এসব স্কুলে ভালো শিক্ষক পাওয়া যায় না।

এমপিওভুক্ত স্কুলগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি এবং সরকারি প্রতিনিধি শিক্ষক নিয়োগ করবেন। সরকারি প্রতিনিধি থাকার কথা বলা হলেও আসলে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি শিক্ষক নিয়োগে বড় ভূমিকা পালন করে। গ্রামের মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে যাঁরা ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হন, তাঁদের বেশির ভাগেরই যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আবার যিনি সভাপতি পদে আসেন, হয়তো দেখা গেছে তিনি শিক্ষানুরাগী নন। এখন অবশ্য মাধ্যমিক স্কুলের সভাপতি হতে গেলে কমপক্ষে গ্র্যাজুয়েশন থাকতে হয়। সরকারি এই প্রজ্ঞাপনের কারণে কমপক্ষে সভাপতি পদে একজন শিক্ষিত ব্যক্তি পাওয়া যায়। তবে বেশির ভাগ সদস্যের অক্ষরজ্ঞান না থাকার কারণে দেখা যায় সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক মিলে তাঁদের পছন্দমতো শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে দেন। এর সঙ্গে রাজনৈতিক দৌরাত্ম্যের কারণে কখনোই গ্রামের মাধ্যমিক স্কুলগুলো ভালো শিক্ষক পায় না।

আমরা সব সময় বলি, গ্রামের ও শহরের স্কুলের মধ্যে শিক্ষার গুণগত মানের পার্থক্য কমাতে হবে। আমি মনে করি, গ্রামের স্কুলগুলোতে শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানো খুব কঠিন কাজ নয়। বাংলাদেশে এখন প্রচুর শিক্ষিত তরুণ আছেন, যাঁদের অনেকেই পিএসসির নন-ক্যাডার পাস করা। আমরা চাইলেই এই শিক্ষক নিয়োগ পিএসসির আন্ডারে নিয়ে নিতে পারি। এই শিক্ষক নিয়োগ যদি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির ওপর ছেড়ে না দিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে করা যায়, তবে গ্রামের স্কুলগুলো অবশ্যই ভালো শিক্ষক পাবে। এখন অবশ্য মাধ্যমিক স্কুলে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় কেন্দ্রীয়ভাবে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে। তবে এখনো সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ম্যানেজিং কমিটির হাতে রয়ে গেছে। এ দুটি পোস্টে চাইলেই সরকার পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ দিতে পারেন।
শিক্ষক নিয়োগ ছাড়াও স্কুল ম্যানেজিং কমিটি গঠনে পরিবর্তন আনা সময়ের দাবি। শিক্ষিত ও গুণীজন পরিচালনা কমিটিতে যেতে না পারলে কীভাবে স্কুলের শিক্ষার মানের পরিবর্তন হবে। এ জন্য আমাদের বিদ্যমান কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের বড় অংশ গ্রামে পড়াশোনা করে। তাদের গুণগত মানের শিক্ষা উপহার দেওয়া না গেলে আমাদের পক্ষে এই বাংলাদেশের পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

কোনো একটি দেশের শিক্ষার মান কেমন, তা নির্ভর করে ওই দেশের গুণগত মানের শিক্ষা একইভাবে সবার কাছে পৌঁছানোর ওপর। যদি এই পার্থক্য ব্যাপক হয়, তবে তাকে বলা হয় বৈষম্যমূলক শিক্ষা। আমাদের দেশে বোধ হয় এই বৈষম্যমূলক শিক্ষা অনেক বেশি। আমরা গ্রাম থেকে এসে যখন শহরের খ্যাতনামা কলেজে ভর্তি হই, তখন এটি ভালো করে বুঝি। আমাদের ইংরেজি উচ্চারণ থেকে শুরু করে বাংলা উচ্চারণ—সবকিছুতেই দুর্বলতা থাকে। ওই বয়সে আমাদের মধ্যে এই দুর্বলতা মানসিক চাপ তৈরি করে। গ্রাম থেকে এসে আমি যখন ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম, তখন এটি হাড়ে হাড়ে বুঝেছি। শুধু আমি নই, গ্রাম থেকে আসা সবার মধ্যে এই হীনম্মন্যতা কাজ করে।

আমাদের এই বৈষম্যমূলক শিক্ষায় পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষার গুণগত মান সুষম হতে হবে। নাগরিক হিসেবে এটি আমাদের মৌলিক অধিকার। আর এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র যদি এগিয়ে না আসে, রাষ্ট্র যদি ভালো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার দায়িত্ব না নিতে পারে, তবে আমাদের গ্রামের ছেলেমেয়েরা কখনোই উন্নত মানের শিক্ষায় আলোকিত হবে না। সময় এসেছে আমাদের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ভাবার। আশা করি সরকার বিষয়টিতে নজর দেবে।

*লেখক: মো. ফজলুল করিম, সহযোগী অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল, বাংলাদেশ। ভূতপূর্ব: ফ্যাকাল্টি, কুমামতো বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান এবং পোস্টডক্টরাল ফেলো, পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন