বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১৭ সেপ্টেম্বর ‌সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজারো ছাত্র–জনতা সমাবেশে উপস্থিত হন। সমাবেশ শেষে মিছিল বের হয়। খবর আসে, জগন্নাথ কলেজে গুলি হয়েছে। মিছিল তখন দ্রুত নবাবপুরের দিকে যায়। হাইকোর্টের সামনে পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে মিছিল আবদুল গণি রোড ধরে যেতে থাকে। পুলিশ তখন পেছন থেকে মিছিলে হামলা চালায়। পুলিশের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ বাধে ঢাকা কোর্টের সামনে। এখানেও পুলিশ ও ইপিআর গুলি চালায়। এতে বাবুল, গোলাম মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহ—৩ জন শহীদ হন, আহত হন শতাধিক এবং শত শত ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দিন শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে মিছিলের ওপর পুলিশ হামলা চালায়।

টঙ্গীতে ছাত্র-শ্রমিক মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়ে হত্যা করে সুন্দর আলী নামের এক শ্রমিককে। পিচঢালা রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হলো। রাজপথকে নরকপুরীতে পরিণত করে পিছু হটল স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার। পারল না বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে। পরবর্তী সময়ে একটি গণমুখী শিক্ষানীতি প্রবর্তনের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। আর ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্র-জনতার গণ–আন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতিবিজড়িত দিনটি প্রতিষ্ঠা পায় ‘জাতীয় শিক্ষা দিবস’ হিসেবে। বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডের অভ্যুদয়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে আছে শিক্ষার সর্বজনীন অধিকার আদায়ের এই আন্দোলন।
সেই সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার ৯ সেপ্টেম্বর ১৪৪ ধারা জারি করে শোভাযাত্রা, পিকেটিং নিষিদ্ধ করলেও ১০ সেপ্টেম্বর ছাত্ররা মিছিল শুরু করলে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী ১৪৪ ধারা ভেঙে ঢাকায় মিছিল করেন। পুলিশ আবুল হাসনাত, আবদুর রহিম আজাদ, আবু হেনা, কাজী জাফর আহমদ, সিরাজুল আলম খান, শাহ্‌ মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাতিল না করলে সারা পূর্ব পাকিস্তানে হরতালের ডাক দেওয়া হয়।

default-image

সোহরাওয়ার্দী জাতীয় পরিষদে এই রিপোর্ট বিবেচনার প্রস্তাব দেন। ১৬ সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় আসেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী ১৬ সেপ্টেম্বর ঘোষণা দেন, সরকার শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বিবেচনা করবে। কিন্তু ছাত্ররা তাঁদের হরতালের কর্মসূচি ঠিক রাখেন। ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকাসহ সারা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ, লাঠিচার্জ ও গুলি চলে। ঢাকায় ৫২ জন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। মোট আহতের সংখ্যা ছিল ২৫৩। ১ হাজার ৫৯ জন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুপুর ১২টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সামরিক বাহিনী নামানো হয়। নবাব হাসান আসকারির গাড়ি আক্রান্ত হয়, নিহত হন গোলাম মোস্তফা। ১৮ সেপ্টেম্বর মৌন মিছিল বের করা হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১৪৪ ধারা জারি থাকে। ২৮ সেপ্টেম্বর প্রতিবাদ দিবস পালনের মাধ্যমে ছাত্ররা ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন।

সেই দিন পল্টন ময়দানে ছাত্রদের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রদের আন্দোলনের উত্তপ্ত অবস্থায় ’৬২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর লাহোরে গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠিত হয় সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান, মাহমুদ আলী ও জহিরউদ্দিনের উদ্যোগে। তারপর শুরু হয় ধারাবাহিক আন্দোলন, যা চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে যায় উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে।

দীর্ঘ লড়াই–সংগ্রাম করে রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি মানচিত্র, স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি লাল-সবুজের পতাকা। পেয়েছি একটি শিক্ষা দিবস। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, দিবসটি এখন বাম প্রগতিশীলেরা ছাড়া তেমন কেউ মনে রাখেন না। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা দিবসের ৫৯ বছর পরও ছাত্রসমাজের সর্বজনীন শিক্ষার যে আকাঙ্ক্ষা, তা আজও পূরণ হয়নি। কিছুটা সংশোধন হলেও সেই ব্রিটিশ-পাকিস্তানি আমলে কেরানি কর্তৃক নির্মিত শিক্ষাব্যবস্থা এখনো বহাল রয়েছে। শিক্ষা ও ছাত্র আন্দোলনের তাৎপর্যপূর্ণ এ ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই অজানা রয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের এ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের কথা। তারা বঞ্চিত এর তাৎপর্য অনুধাবন থেকে।

শিক্ষা এখনো বাজারে ওঠে, চলে শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা। তবে পার্থক্য একটাই, আগে বিক্রি হতো খোলাবাজারে আর এখন বিক্রি হয় শোরুমে। হু হু করে বাড়ছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে পড়তে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন, যা দেশের অধিকাংশ মানুষের পক্ষে বহন করা অসম্ভব। তা ছাড়া এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই শিক্ষার যথাযথ মান। অবশেষে উন্নতির পথে অগ্রসর হতে গিয়ে আমরা পেয়েছি জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০। যেখানে চমৎকার সাবলীল ভাষায় ও কৌশলে দেওয়া হয়েছে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’।

শিক্ষা দিবসের চেতনায় উঠে আসা সর্বজনীন, বৈষম্যহীন ও একই ধারার বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে শিক্ষাকে করা হয়েছে বেসরকারীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ। যার প্রভাবে সারা দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা—সর্বস্তরেই চরম নৈরাজ্য চোখে পড়ছে। দেশে এখনো রয়ে‌ গেছে শিক্ষকসংকট। এখনো জাতীয়করণের দাবিতে এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের আমৃত্যু অনশনে যেতে হয়, যা শিক্ষা দিবসের চেতনার পরিপন্থী।

আমাদের স্মরণে রাখা উচিত, সেদিন ওয়াজিউল্লাহ, বাবুল‌ ও গোলাম মোস্তফাদের রক্ত রাজপথে শুকিয়ে যায়নি, সঞ্চালিত হয়েছিল জাতির ধমনিতে, মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরায়। আর ওই রক্তের স্রোত গিয়ে মিশেছিল আরেক রক্তগঙ্গায়। অবশেষে গিয়ে মিলিত হয় স্বাধীনতার মোহনায়।

তাই দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সর্বজনীন মতামতের ভিত্তিতে একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা, যেখানে শিক্ষা হবে সবার জন্য অবাধ। ‘শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, শিক্ষা সবার অধিকার’, এটি সর্বস্তরে প্রতিফলিত হোক মহান শিক্ষা দিবসে।

default-image

তাৎপর্যপূর্ণ মহান শিক্ষা দিবসের ইতিহাস মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা‌ এখন সময়ের‌ দাবি। রাষ্ট্রীয়ভাবে দিনটি পালনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। শিক্ষা দিবসের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে গ্রাম ও শহরের মধ্যে শিক্ষার যে বৈষম্য বিরাজমান, তা দূর করতে হবে।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বলতে হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো শিক্ষানীতির‌ কার্যকর নেই, বহুবিধ ধারায় শিক্ষা চলছে,‌ শিক্ষা এখন ‌পণ্যে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক ভাবধারায় সিলেবাস ভারাক্রান্ত, শিক্ষার নামে‌ অবাধে চলছে সার্টিফিকেট–বাণিজ্য, শিক্ষার মান আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে এসেছে। আমাদের শিক্ষার‌ মান, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার মান কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, তা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়।‌

শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য ও বৈষম্য দূর করতে না পারলে একটি যুগোপযোগী কার্যকর শিক্ষা কমিশন গঠন এবং এর বাস্তবায়ন করতে না পারলে শিক্ষার‌ সার্বিক উন্নয়ন ‌সম্ভব‌ হবে না। করোনাকালে এ সময়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা একদম ভেঙে পড়েছে। শিক্ষা খাতের পুনর্গঠনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। করোনার সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব ধরনের বেতন-ফি মওকুফ করতে হবে, পিইসি ও জেএসসির মতো অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা বাতিল করতে হবে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপিত ট্যাক্স প্রত্যাহার করতে হবে, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মূল্যবোধ, মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে হবে। করোনার সময়ে শিক্ষা খাতের ভয়াবহ ক্ষতি‌ দ্রুততম সময়ে পুষিয়ে নিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি, একটি মানসম্মত, যুগোপযোগী ও কল্যাণকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠুক, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন