বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২.
ইউরোপের দেশগুলোতে স্কুলের ছেলেমেয়েদের প্র্যাকটিক্যালি শেখানো হয় কীভাবে রাস্তা পার হবে, কোন সিগন্যালের অর্থ কী। কিন্তু আমাদের দেশে এসব প্রতিষ্ঠানে বসে বসে মুখস্থ করানো হয়। ওই সব দেশের ছেলেমেয়েকে নিজের কাজ নিজে করার জন্য উৎসাহিত করা হয়, আমাদের বাবা–মায়েরা এক গ্লাস পানি পর্যন্ত এগিয়ে দেন। এতে ছেলেমেয়ের ক্ষতি হচ্ছে, এটা বুঝতে চান না ওনারা। আমরা বুঝতে চাই না ‘গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন’ আমাদের কোনো কাজে আসে না। উন্নত দেশের ছেলেমেয়েদের ১৮ বছর বয়স থেকে নিজের খরচের টাকা নিজেকে জোগাড় করতে হয়। পাশাপাশি তাঁরা পড়ালেখাও চালিয়ে যান, কিন্তু আমাদের দেশের ছাত্রদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তাঁদের বিসিএস ক্যাডার বা চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হতে হবে। এর আগে কোনো কিছু করা যাবে না। ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির চাকরি খুঁজতেই আমরা ব্যস্ত থাকি। এর বাইরের সবকিছুকে আমরা ছোট করে দেখি। ওই ৩০ বছর বয়স হতে হতে উন্নত দেশের ছেলেমেয়েরা নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে একটা বড় অ্যামাউন্ট জমা করে ফেলেন। কারণ, তাঁরা তো ১৮-৩০ বছর বয়স পর্যন্ত কাজ করেই যান। প্রথম শ্রেণির কাজের জন্য অপেক্ষা করেন না, কোনো কাজকে ছোট মনে করেন না। তাই তাঁরা বেকার থেকে আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেন না আমাদের মতো।

৩.
উন্নত দেশের সরকারের কথা যদি বলি, তাহলে প্রথমেই বলতে হয় ওই সব দেশের লোকজন নিজের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন। আমাদের মতো টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যান না তাঁরা। আমাদের দেশে একবার নির্বাচিত হতে প্রার্থীকে যত টাকা খরচ করতে হয়, তার ২৫ শতাংশ টাকাও তাঁরা খরচ করেন না। কারণ, আমাদের ভোট টাকা দিয়ে কেনা যায়, তাঁরা টাকা দিয়ে ভোট বিক্রি না করে নিজের পছন্দমতো যোগ্যতাসম্পন্ন লোককে নির্বাচিত করেন। তাই তাঁদের দেশের উন্নয়ন সম্ভব হয়।
ইউরোপের প্রায় দেশের নাগরিকেরা ট্যাক্স দেন সরকারকে। এ জন্য তাঁদের নিরাপত্তা, সুযোগ–সুবিধার কোনো কমতি নেই। তাঁরা কর্মহীন হলে বেকার ভাতা পান, বৃদ্ধ বয়সে বয়স্ক ভাতা পান। কিন্তু আমাদের দেশে আমরা যত টাকাই আয় করি না কেন, আমরা ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েই থাকি। আমাদের মনোভাবটা এমন যেন, ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’।

৪.
কোনো দেশের শিক্ষার গুণগত মানই বলে দেবে সে দেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে কতটুকু সফল হবে। জীবনের প্রথম জ্ঞান অর্জন ভয়ে নয়, উৎসাহের সঙ্গে জানা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা নয়, প্রয়োজন সহযোগিতার। প্রতিযোগিতা জয়ী হতে সহায়তা করে বটে, কিন্তু জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে না। প্রতিভা ক্ষয়ের অন্যতম কারণ এ প্রতিযোগিতা। বর্তমানে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষা থেকে সরিয়ে নিয়ে করে ফেলেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার অন্তঃসারশূন্য একটা প্রতিযোগিতায়। জাপানের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বলতে বোঝায় প্রথমত নীতিনৈতিকতা, পরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষার ছয় বছর জাপানিরা শিশুদের শেখায় নম্রতা, ভদ্রতা ও নীতিনৈতিকতা। আমাদের দেশে শিশুশ্রেণি থেকে অনার্স লেভেলে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত আমরা একটা প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকি, এ সময় আমাদের মূল লক্ষ্যই থাকে অন্য ছাত্রদের চেয়ে বেশি নম্বর পাওয়া। আমরা ধার ধারি না নীতিনৈতিকতার। বেশির ভাগ মা–বাবা এ সময় ছেলেমেয়েদের ভালো মানুষ হওয়ার চেয়ে ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য জোরাজুরি করেন, যার ফলস্বরূপ আমরা ভালো নম্বর পাই বটে, কিন্তু ভালো মানুষ আর হয়ে উঠি না।

কিছুদিন আগে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর বাবা সন্তানের চাকরির জন্য ১০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েও ছেলের চাকরি না হওয়ায় মানসিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়ে প্রতারিত হওয়ার কাহিনি লিখে আত্মহত্যা করেন। এ টাকা দিয়ে তিনি যদি তাঁর ছেলেকে ব্যবসা করার জন্য উৎসাহিত করতেন, তাহলে আজ তাঁর ছেলেমেয়েদের বাপছাড়া হতে হতো না। এটাও একধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের সমাজে। সমাজে যাঁর টাকা বেশি বা যেকোনো উচ্চ পদে চাকরি করেন, তাঁকেই আমরা বেশি গুরুত্ব দিই। অনার্স-মাস্টার্স পাস করেও তাই এ দেশের ছাত্রদের যেকোনো শ্রেণির সরকারি চাকরির জন্য কয়েক বছর পরিশ্রম করে যেতে হয়। এসব চাকরির জন্য আমরা নীতিনৈতিকতার ধার ধারি না। অনৈতিকভাবে ঘুষ দিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করতেও দ্বিধাবোধ করি না আমরা। এসব ঘটনা উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায় না। কারণ, তারা নৈতিকতার দিক দিয়েও আমাদের চেয়ে উন্নত।

আপনি বা আমি, আমরা সবাই মিলে যদি নিজেরা সৎ হই, নিজেদের বিবেক–বুদ্ধিকে জাগিয়ে তুলতে পারি, তাহলেই দেশ এগিয়ে যাবে, নিয়ম–পদ্ধতি বদলাবে। আমরা যদি এসব না করে শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের দেশের অসংগতি তুলে ধরি, তাহলে দেশের নিয়ম–পদ্ধতি কোনো দিনও পাল্টাবে না। চলুন, নিজে পাল্টাই, পাল্টে দিই সমাজ, পাল্টে দিই দেশ।

*হালিমা সাদিয়া, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন