হইচই এবং অবকাশের দিনলিপি

পাশাপাশি দুটো ডুপ্লেক্স ভাড়া নেওয়া হয়েছে। দুটো ভবনেরই নিচতলাতে রান্না- খাবার ঘর কাম বসার ঘর আর একটা গেস্টরুম, ওপরতলায় শোবার দুটো ঘর আর বিশাল টানা বারান্দা। মালপত্র সব এনে রাখা হলো প্রথম বিমানবন্দরের নিচতলায়, বসার ঘরে। আমরা সব বেলার খাবার ভাগাভাগি করে রান্না করে এবং বাজার করে এনেছিলাম। সেগুলো এখন ফ্রিজে বা যথাস্থানে রাখার দরকার। সেই সঙ্গে কে কোনো ঘরে দুই দিনের সংসার পাতবে, সেটাও ঠিক করা দরকার।

গল্পের সুবিধার্থে ধরে নিই প্রথম এপার্টমেন্টটার নাম হইচই আর দ্বিতীয়টার নাম অবকাশ। হইচইয়ের নিচতলাতে সবাই একসঙ্গে সব বেলাতে খাবে পরিকল্পনা এমন হল। বৈকালিক চা-আড্ডা বা ইবাদতের মগ্নতার জন্য অবকাশকে বেছে নেওয়া হলো। আর ওপরতলাগুলোতে তো দরকারমতো শোবার ঘর আছেই। যাদের ছেলেপেলে একটু বড়, তারা হইচইতে অবস্থান করবে এমন সিদ্ধান্ত হলো। পরেরটায় ছোট শিশুরা। আমি অবকাশে চলে গেলাম মালসামান নিয়ে।

ঘরে বালিশ বিছানা পাতা শেষ, বাচ্চাদের ধোয়া পালা-খাওয়ানো শেষ, তারা এবাড়ি–ওবাড়ি হেঁটে বেড়াচ্ছে রাজহাঁসের মতো। আমি অবকাশের খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাহাড়ের ফিসফিস এবং প্ররোচনায় কান পেতেছি কেবল। পাহাড়ের ওপর দেখা যাচ্ছিল একটা শ্লস, বাংলাভাষায় দুর্গ। ঠিক যেন জন্মদিনের কেকের ওপর টেঁসে রাখা দুর্গ। টাওয়ার, র‍্যাম্পার্টস, গেটওয়ে সব বানানো হয়েছে ফনডেন্টে। মনে হলো আকাশ ভেঙে বরফ পড়ার দিনগুলোতে পাহাড় ঢেকে যায় বরফে, দুর্গও তো ঢেকে যায়। দৃশ্যটা তখন আরও মাখন মোলায়েম কেকসুলভ হওয়ার কথা। আর তখন খেয়াল করলাম বেলা গড়িয়েছে। শান্ত দুপুর বলে ঘড়ি দেখতে প্রবৃত্তি হচ্ছে না। ক্ষুধা লেগেছে আসলে। ক্ষুধার রাজ্যে ঢুকে পড়ার কারণে পাথুরে শ্লসকে কেকের টপিং বলে ভ্রম হচ্ছে।

কাকতালীয়ভাবে হইচই থেকে এক শিশু দূতের মাধ্যমে খবর এল রাখী ভাবির সারপ্রাইজ ইতিমধ্যে ঘোষিত হয়ে গেছে। দম বিরিয়ানি খাওয়ার ডাক এসেছে ও বাড়ি থেকে।

২.
বিকেলেই কাছের প্ররোচনাদানকারী পাহাড়টায় যাওয়ার কথা আছে। অথচ বিরিয়ানি ঘুমের আলস্যে টাল হয়ে গিয়েছি যেন। এসব সফরে আমি হালকা খাবারের পক্ষে সব সময়। তাহলে হাঁটতে সুবিধা-দেখতেও। আমি ঘুম তাড়াতে টি–ব্যাগের বন্দোবস্ত করছি, যখন দেখতে পেলাম রাখী ভাবি আরামদায়ক হাঁটার পোশাক, জুতা, গগলসে একদম তৈরি। বাচ্চারাও সবার আগে ফিটবাবুটি। যে রাঁধে সে তো চুল বাঁধবেই, গুরুজনেরা তো হিসাব করেই ভবের মাঝারে বাণীগুলো ছেড়েছিলেন!

আদনান জুম্মি দম্পতির ভেতর যার নাম আদনান, তার কানে অধিকাংশ সময়ে থাকে ফোন। প্রজেক্ট-প্রেজেন্টেশন কিংবা লোকাল ক্রিকেট সিরিজের ভেন্যু- ফুটবলের জার্সি...কথার গাড়ি চলছে তো চলছে, চলছে তো চলছে। পাহাড়টা ছোটখাটো হলেও কিছুটা খাড়া। ওপরে উঠতে একটু ঝামেলা হচ্ছিল। এসব খাড়া বা ঝামেলা তার ফোনালাপে ব্যত্যয় ঘটাতে পারছিল না।

সে আলাপে আলাপে সবার পেছনে পড়ে গিয়েছিল। এত মানুষের সামনে রাগ দেখানো যায় না। তাই ফোন একান–ওকান প্রতিভায় মুগ্ধ হওয়া ছাড়া উপায়ও থাকে না। তার ওপর সঙ্গে আছে বাচ্চারা। সবগুলো বাচ্চা টুই টুই গল্প করতে করতে ভালোই পাহাড় বাইতে পারছিল। আমার বড় চিপমাঙ্ক সালাউদ্দীন ভাইয়ের হাত ধরা। তবে চার বছর বয়সী ছোটটা চঞ্চলতার অবদমন করতে পারছিল না। বারবার হাত ফস্কে কোন বনে যেন ছুটে যেতে চাচ্ছিল। আমি তখন ছোট চিপমাঙ্ককে আষ্ঠেপৃষ্ঠে ধরে রেখে মুগ্ধতাকে ভাগিয়ে দিয়ে এক পাশে দাঁড়ালাম। রাগমুখী হয়ে আলাপীর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। দৃষ্টিতে ‘আজকে তোমার খবর আছে’! দূর থেকে আমাকে ওভাবে শ্যেনদৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কী করবে বুঝতে না পেরেই হয়তো হাসি হাসি মুখে পাহাড়ের একদম কিনারায় গিয়ে পড়ে যাওয়ার অভিনয় করল।

অভিনয় বেশ ভালো হয়েছিল। কোত্থেকে যেন একটা ডানা ঝাঁপটানো চিল চিকন চিৎকার হয়ে হাত বাড়ালেই ধরা যাবে এমন আকাশে মিশে গেল।