সংগত কারণেই সুইজারল্যান্ড এখন আর নিরপেক্ষতাকে অন্ধভাবে একা চলা বা থাকা হিসেবে দেখে না। এ কারণেই একটা নির্দিষ্ট সময়ে এটি পশ্চিমা প্রতিরক্ষা জোট ন্যাটো এবং তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক অংশীদারত্ব বজায় রেখেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো সাধারণ সেনাবাহিনী নেই। কিন্তু পেস্কো (Permanent Structured Cooperation-PESCO বা স্থায়ী কাঠামোগত সহযোগিতা) এর অংশ হিসেবে কিছু ইইউ (ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন) দেশ একটি সামরিক জোটের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বজায় রাখে। যুদ্ধংদেহী মনোভাব ছেড়ে এ জোটগুলো বরং শিথিল অস্ত্র বা শিক্ষামূলক প্রকল্পের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়, যা এখন পর্যন্ত তার উদ্দেশ্য বজায় রেখেছে।

পেস্কো সম্প্রতি সদস্য নয় রাষ্ট্রগুলোকে তার প্রকল্পগুলোয় অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। এ পর্যন্ত কানাডা, নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্র তাতে অংশ নিয়েছে। সুইজারল্যান্ডও বেশ কিছু পেস্কো প্রকল্পে যোগদানের দিকে নজর দিচ্ছে। এ মুহূর্তে সুইজারল্যান্ড সাইবার প্রকল্পে বিশেষভাবে আগ্রহী। সম্প্রতি সুইস প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যে এটা স্পষ্ট, এ ধরনের সহযোগিতা এমন কোনো বাধ্যবাধকতার মধ্যে সুইজারল্যান্ডকে জড়াবে না, যা সুইস নিরপেক্ষতার সঙ্গে আপস করবে। সুইস প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভায়োলা আমহার্ড গত বছর বলেছিলেন, সেনা মোতায়েন করা কখনোই পেস্কোর সঙ্গে সমস্যা সৃষ্টি করবে না, যার পরিপ্রেক্ষিতে সুইস অংশগ্রহণ নিরপেক্ষতার নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। ২০১১ সালে তৎকালীন সুইস প্রেসিডেন্ট মিশেলিন ক্যালমি-রে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি আসনের প্রস্তাব করেন, যা ফেডারেল কাউন্সিল এবং সংসদ অনুমোদন করে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দুই বছর মেয়াদের সদস্যপদের জন্য (১ জানুয়ারি ২০২৩ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪) নির্বাচন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২০২২ সালের জুনে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র অংশ নেবে। সুইজারল্যান্ডের প্রার্থিতা জাতিসংঘের অভ্যন্তরে এবং সারা বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য তার নিযুক্তির ধারাবাহিকতা কতটুকু রক্ষা করবে, তা সময়ই বলবে। ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতিষ্ঠিতার ৫৭ বছর পর সুইজারল্যান্ড জাতিসংঘে যোগ দেয়। ২০০২ সালে জাতিসংঘে যোগ দেওয়ার পর থেকে সুইজারল্যান্ড নিরাপত্তা পরিষদ ব্যতীত সংস্থার সব প্রধান সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছে।

স্নায়ুযুদ্ধের শেষে ন্যাটো ওয়ারশ চুক্তির সাবেক সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার প্রস্তাব করেছিল—যারা আগে ন্যাটোর শত্রু বা বিরুদ্ধবাদী ছিল। ১৯৯৪ সালে পার্টনারশিপ ফর পিস (পিএফপি) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ন্যাটোর সদস্য নয়, এমন অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার ব্যাপ্তি বাড়ানোর জন্য। শান্তি কর্মসূচিতে অংশীদারত্ব এবং অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্নায়ুযুদ্ধের পর সুইজারল্যান্ড ন্যাটোর খুব কাছাকাছি আসে। পার্টনারশিপ ফর পিস প্রোগ্রাম এমন এক সময়ে উভয় পক্ষের জন্য আকর্ষণীয় ছিল, যখন বিশ্বে উত্তেজনা কমছিল এবং ন্যাটো সম্মিলিত প্রতিরক্ষার বাইরেও অন্যান্য বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুসরণ ও অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিল।

সুইজারল্যান্ড শান্তির জন্য অংশীদারত্ব নিয়ে কোনো সমস্যা দেখছে না। এতে বলা হয়েছে, এ কর্মসূচির লক্ষ্য হচ্ছে অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা করা। যেহেতু এই অংশীদারত্ব একটি আইনি প্রতিশ্রুতি বা স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করে না, সুতরাং এটি সুইস নিরপেক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অন্যান্য নিরপেক্ষ রাষ্ট্র যেমন ফিনল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, মাল্টা, অস্ট্রিয়া ও সুইডেনও শান্তির জন্য অংশীদারত্বে অংশ নেয়। যেহেতু পার্টনারশিপ ফর পিস স্পষ্টতই একটি প্রতিরক্ষা জোট নয় এবং এখানে সহায়তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, তাই এটি নিরপেক্ষতার সঙ্গে আপস করে না। সুইডেন, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও আয়ারল্যান্ড সুইজারল্যান্ডের চেয়ে ন্যাটোর সঙ্গে আরও বেশি ঘনিষ্টভাবে সহযোগিতা করে।

ভৌগোলিকভাবে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড ন্যাটোর জরুরি প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। উভয় দেশই ন্যাটোর সঙ্গে নিয়মিত সামরিক মহড়া চালায় এবং ১৯৯৫ সালে ইইউতে যোগ দেওয়ার পর তাদের নিরপেক্ষতার অবসান হয়েছে বলে বিবেচনা করা হয়।

এটি সহজেই অনুমেয়, কেন আলপাইন দেশটি ন্যাটো ও পেস্কোর কাছাকাছি আসছে। সুইস আর্মি এ ধরনের সহযোগিতাকে উপকারী বলে মনে করে, কারণ এর উদ্দেশ্য হলো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সামরিক আন্তঃকার্যক্ষমতা অনুশীলন করা। সুতরাং সুইজারল্যান্ড সব সময় প্রশিক্ষিত হচ্ছে এবং সংকটের মোকাবিলায় প্রস্তুত। তবে কোনো সংকটের মুখোমুখি না হওয়া পর্যন্ত এটি কঠোরভাবে তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে। আক্রমণ না হওয়া পর্যন্ত সুইজারল্যান্ড নিরপেক্ষ থাকবে, এটা ধরেই নেওয়া যায়।

সংগত কারণেই সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশ, যাদের সামরিক–বহির্ভূততার ইতিহাস রয়েছে, তারা তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে। সুইজারল্যান্ড ও ন্যাটোর মধ্যে সম্পর্ক এখন বেশ ভালো। ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলা এবং ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল করার পর থেকে সুইস ও ন্যাটোর স্বার্থ অভিন্ন হয়ে গেছে। যেহেতু যৌথ প্রতিরক্ষা নীতিটি ন্যাটোর অ্যাজেন্ডায় ফিরে এসেছে, তাই সদস্যপদ সুইজারল্যান্ডের জন্য কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ড কোনো অস্পষ্টতায় পা রাখতে চায় না। সুইস মিলিশিয়া সেনাবাহিনীর প্রতি ন্যাটোর আগ্রহও সীমিত। বরং ন্যাটো কূটনীতি পরিচালনা করা যেতে পারে, এমন একটি দেশ সুইজারল্যান্ডে বেশি আগ্রহী, যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশ একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের দ্বারা উপকৃত হতে পারে।