সেই সময়টায় বাতাসে ছিল বারুদ আর গলিত লাশের গন্ধ,
নদীনালায় ভাসছিল প্রিয়জনের ক্ষতবিক্ষত লাশ,
আগুনে পোড়া, পরিত্যক্ত বাড়ি-ঘর, পলাতক মানুষ,
কিন্তু আমাদের তখন একটাই পরিচয় ছিল, আমরা সবাই জয়বাংলার লোক।
তারপর একদিন স্বাধীনতা এল, বিজয় এল,
আহা, স্বাধীনতা! আহা, বিজয়!
কত কাঙ্ক্ষিত সেই বিজয়ের দিন!
কী আনন্দ সবার চোখেমুখে, উজ্জ্বল জ্বলজ্বলে সব মুখ,
সবার হাতে, পথে ঘাটে উড়ছে লাল-সবুজ পতাকা।
মুখে বিজয়ের হাসি, কাঁধে বন্দুক, চোখে প্রত্যাশা,
ফিরে এল শ্রান্ত, রণক্লান্ত মুক্তি সেনারা।
কিন্তু কতজন যে এল না, সে হিসেব কেউ জানে না,
ধীরে ধীরে অপেক্ষার প্রহরও শেষ হলো একদিন,
অনেকেই আর ফেরেনি, তাদের আর ফেরা হয়নি কোনো দিন।
উৎসাহী টগবগে যে তরুণ,
মায়ের শাড়ি দিয়ে নতুন পতাকা বানিয়েছিল,
সেই ছেলেটাকে কোথাও দেখিনি আর।
তবে কী সে আজ ওই লালসবুজেই মিশে গেছে?
এমনই কত কত মুখ আর দেখি না জনতার ভিড়ে।
মালতিবালা নামের সেই হিন্দু মেয়েটি,
শরীরে যার ছিল চাঁপাফুলের সুবাস।
সেই সুবাস টের পেয়েছিল পাকসেনারা, রাজাকারের দল।
অত তীব্র গন্ধ তার হিন্দু বাবা-মা লুকাতে পারেনি কোথাও।
চাঁপাফুল বুটের তলায় পিষ্ট হয়েছিল।
কিন্তু সারা দেশে তার সুবাস ছড়িয়ে গিয়েছিল।
তাই এখনো দেশীয় শকুনেরা গন্ধ শুঁকে শুঁকে তাকেই খোঁজে।
এখন বিজয়ের উৎসবে কত আনন্দ হয়।
উৎসবে কতগুলো চেনামুখ দেখি প্রতিবার!
যারা সামনের সারিতে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকে।
কত লালসবুজ পতাকা দেখি, ফুল আর মালা দেখি,
কিন্তু বিজয় দেখি না, স্বাধীনতা দেখি না কোথাও!
গান হয়, কবিতা হয়, ছবি আঁকা হয়,
কিন্তু পতাকা হাতে রোকেয়া হলের সেই মেয়েগুলোকে আর দেখি না।
জয়বাংলা নামটি একদিন ছিল আমাদের সবার।
আজ দেখছি নামটি পেটেন্ট করা ট্রেডমার্ক হয়ে গেছে কারও কারও।
যদিও আজও আমরা মনেপ্রাণে সবাই জয়বাংলা আছি।
বিজয়ের উৎসবে গালে সবুজ পতাকা আঁকা উৎফুল্ল কত মেয়েদের দেখি।
কিন্তু মিছিলের মুখ, সেই তেজি মেয়েটিকে টিএসসির সবুজ চত্বরে আর দেখি না।
তবে কী সে মিশে আছে ওই সবুজ ঘাসে, কিংবা রঙিন প্রজাপতির পাখায়?
মিছিলের সেই তেজদীপ্ত মুখগুলো মঞ্চ আলোকিত করে না আর।
আমাদের একটিমাত্র ভাষা,
আমরা সবাই বাংলাকে ভালোবাসি।
আমাদের ছোট্ট একটি সোনার টুকরো দেশ।
একটি লালসবুজ পতাকা,
দোহাই তোমাদের, কেউ আর পক্ষ-বিপক্ষ টেনে ভেঙো না দেশের একতা।
দেশ বাঁচলেই আমরা বাঁচব।
কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয় আমাদের স্বাধীনতা!