মহুয়া-মলুয়ার দেশের খাবার
মাই মেন সিং (মনমনসিংহ) ‘আমার লোকেরা গান গায়’ এমন একটি বাক্য প্রচলিত আছে! মহুয়া–মলুয়া জারি, বাউল, পালাগানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এই অঞ্চলের নাম ছিল নাসিরাবাদ। এর আগেও এর নাম ছিল মোমেনশাহী। আঞ্চলিক লোকেরা অনেকেই ডাকে মমিসিং নামে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের নামের সঙ্গে এঁটে আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মুগ্ধতায় ব্রহ্মপুত্র নদী ঘেরা এই ময়মনসিংহ জেলা। আজ পাঠকদের জন্য এখানে আয়োজন করা হয়েছে ময়মনসিংহ অঞ্চলের কয়েকটি বিখ্যাত রান্নার রেসিপি—
মাষকলাইয়ের ডাল দিয়ে রুইয়ের মাথা
উপকরণ: মাষকলাইয়ের ডাল দিয়ে রুই মাছের মাথা রান্না করতে খুব বেশি উপকরণ লাগে না। প্রয়োজনীয় এসব উপকরণ সাধারণত আমাদের ঘরেই থাকে। এখানে পরিবারের ৪ / ৫ জনের খাওয়ার মতো রান্নার উপকরণ ও পরিমাণ দেওয়া হলো—তেল (পরিমাণমতো), পেঁয়াজ কুচি (দুই টেবিল চামচ), তেজপাতা (দুটি), হলুদ গুঁড়া (আধা চা চামচ), মরিচ গুঁড়া (এক চা চামচ), জিরার গুঁড়া (আধা চা চামচ), ধনে গুঁড়া (আধা চা চামচ), আদা বাটা (এক চা চামচ), পেঁয়াজ বাটা (দুই টেবিল চামচ), পানি (পরিমাণমতো), লবণ (স্বাদমতো), রুই মাছের মাথা (একটি), মাষকলাইয়ের ডাল (এক কাপ), আস্ত কাঁচামরিচ (৮-১০ টি), পেঁয়াজ বেরেস্তা (পরিমাণমতো)।
প্রণালি: প্রথমে ডাল শুকনো করে ভেজে সেদ্ধ করে নিতে হবে। তারপর রুই মাছের মাথা ভালো করে ধুয়ে লবণ, হলুদ গুঁড়া মাখিয়ে ভেজে নিতে হবে। কড়াইয়ে তেল দিয়ে শুকনো মরিচ, তেজপাতা, গোটা জিরা ফোড়ন দিতে হবে। তাতে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে ভাঁজতে হবে। পেঁয়াজ ভাজা হলে আদা ও রসুন বাটা দিন। হলুদ, মরিচ, ধনে, জিরা গুঁড়া দিয়ে কষাতে হবে। মসলা কষা হলে আগে থেকে ভেজে রাখা মাথা দিয়ে কষাতে হবে। তাতে আগে থেকে সিদ্ধ করা ডাল, লবণ, সামান্য চিনি ও পরিমাণ মতো পানি দিতে হবে। ডাল ফুটে এলে গরম মসলা গুঁড়া, ঘি, ধনে পাতা কুঁচি ছড়িয়ে দিতে হবে।
মুক্তাগাছার মণ্ডা
প্রায় দুই শ বছর আগে গোপাল পাল নামে একজন স্বপ্নে মুক্তাগাছার মণ্ডার রেসিপি পান। তিনি মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর কাছে নিয়ে গেলে খুবই প্রশংসিত হন। তারপর থেকে এই মুক্তাগাছার মণ্ডার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।
উপকরণ: মণ্ডা বানানোর কৌশল সাধারণত মণ্ডা তৈরির মূল উপাদান হলো খাঁটি দুধ, ছানা ও চিনি। তবে মণ্ডা তৈরির পর ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হয় না। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় গরমের সময় ৩ থেকে ৫ দিন ও শীতকালে ১০ থেকে ১২ দিন মণ্ডা ভালো থাকে।
প্রণালি: প্রথমে দুধকে ঘন করে ছানা তৈরি করা হয়। এরপর ছানার সঙ্গে চিনি মেশানো হয়। ওই ছানাকে নরম অবস্থায় গোল করে একটি বড় মণ্ড তৈরি করা হয়। এরপর ওই মণ্ডকে পরিষ্কার শক্ত কোনো স্থানের ওপর বিছানো কাপড়ের ওপর হাত দিয়ে ছুড়ে আছাড় মেরে মেরে চ্যাপ্টা করা হয়। পরে তা ঠান্ডা হলে শক্ত হয়ে যায় এবং তখন কাপড় থেকে খুলে নেওয়া হয়। তাই মণ্ডের যেই অংশ নিচে থাকে, তা সোজা হয়, আর অন্য দিকগুলো একটু উঁচু হয়। কোনারগুলো একটু ফাটা ফাটা হয়। মণ্ডের রং সাদা বা খয়েরি হয় ছানার রঙের ওপর ভিত্তি করে।
গরুর মাংসের শুঁটকি
উপকরণ: রান্নার জন্য লাগবে—গরুর মাংসের শুঁটকি ১/২ কেজি (আগে থেকে হাড় ছাড়া গরুর মাংস ছোট ছোট টুকরা করে কেটে, ধুয়ে সুই-সুতা দিয়ে ২-৩ দিন ধরে কড়া রোদে লবণ ও হলুদ গুঁড়া মাখিয়ে শুকিয়ে নিতে হবে), পেঁয়াজ বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, মরিচ গুঁড়া ১ চা চামচ, হলুদ গুঁড়া ১/২ চা চামচ, ধনে গুঁড়া ১ চা চামচ, জিরা বাটা/জিরা গুঁড়া ১/২ চা চামচ, কাঁচা মরিচ ২ চা চামচ, এলাচি ৩ টি, দারুচিনি টুকরা ৩ টি, তেজপাতা ৩/৪ টি, তেল ১/৩ কাপ, লবণ পরিমাণমতো।
প্রণালি: প্রথমে গরুর মাংসের শুঁটকি গরম পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নিন। এবার প্রেশার কুকারে সামান্য পানি দিয়ে চুলায় বসিয়ে দিন। যখন ৭-৮টা সিটি দেবে, তখন চুলা থেকে নামিয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। তারপর একটি প্যান-এ গরম মসলা ও লবণ লাগলে দিয়ে তার গন্ধ ছড়ানো পর্যন্ত ভেজে নিন। এরপর এতে পেঁয়াজ কুচি, মসলা দিয়ে আরও কিছুক্ষণ কষিয়ে নিন। মসলা কষানো হয়ে গেলে, তাতে গরুর মাংসের শুঁটকি দিয়ে ভালো করে কষিয়ে নিন। এখন এক কাপ পানি দিয়ে ঢাকনা দিয়ে রাখুন। পানি শুকিয়ে তেল উঠে এলে নামিয়ে নিন!
কুমড়ো পাতায় চেপার পুলি
উপকরণ: কুমড়ো পাতায় চেপার পুলি রান্নায় যা লাগবে—কুমড়ো পাতা ১২ টি, পেঁয়াজ মাঝারি ১০ টি, রসুন ৮ / ১০ টি, হলুদ গুঁড়া ৪ চা চামচ, মরিচ গুঁড়া ৪ চা চামচ, ধনে গুঁড়া দেড় চা চামচ, কাঁচা মরিচ ৫ টি, চেপা ৬ টি, তেল পরিমাণ মতো, লবণ স্বাদ মতো।।
প্রণালি: প্রথমে পাতা ভালো করে ধুয়ে নিন। চেপা ধুয়ে নেবেন ভালো করে। এবার একটা পেনে তেল দিয়ে পেঁয়াজ রসুন (কিউব করে কাটা) আর চেপা দিয়ে ভাজবেন, হালকা ব্রাউন হলে তাতে এক এক করে সব মসলা দেবেন, কাঁচা মরিচ ফালি করে কেটে দেবেন। পানি অল্প অল্প দেবেন আর কষাবেন ভালো করে। তেল মসলা আলাদা হয়ে গেলে উঠিয়ে নেবেন লবণ চেক করে। এবার একটা পুলির জন্য তিনটা পাতা নেবেন আর মসলা নেবেন, পাতাগুলো একটা আর একটার ওপর দিয়ে সাজাবেন আর মাঝখানে মসলা দেবেন, এবার পাতা মুড়িয়ে নেবেন ভালো করে। পেনে অল্প তেল দেবেন আর পুলিটা ধরে পেনে পাতার মুখ নিচে দিয়ে দেবেন আর একটা ভারী চামচ দিয়ে পুলির ওপরে চাপ দিয়ে ধরবেন, হাত দিয়ে ছিটা দিয়ে পানি দেবেন, অল্প তেল দেবেন আর ওপর নিচ করে দেবেন, ডেকে দেবেন যেন পাতা ভালো করে সিদ্ধ হয়। এবার উঠিয়ে নিন। এভাবে সব করে নিন। শেষে সব পুলি তেলে ভেজে নিন সুন্দর করে, একদম কালচে কালার হলেই বুঝবেন, হয়ে গেছে। অনেক মজার এই ঝালি কুমড়া পাতা দিয়ে চেপার পুলি।