নারীদের উন্নয়নে বদলাতে হবে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি
নারী, সমাজের প্রিয় চেনা রূপে যারা কেবলই মা, স্ত্রী, বোন ও কন্যা। এর বাইরে তাদের অস্তিত্ব খুঁজতে সমাজ একটু বেশিই নারাজ। হ্যাঁ, একবিংশ শতাব্দীতে আজ কিছুসংখ্যক নারী সফল হয়েছে স্বপ্নপূরণে, কিন্তু তার পেছনের ইতিহাসগুলো মর্মান্তিক। কবি–সাহিত্যিকেরা নারীদের বীরাঙ্গনা, মহীয়সী নাম দিলেও আজও তাদের প্রাপ্তি কতটুকু, সেটাই ভাবার বিষয়। এখনো এই পুরুষশাসিত সমাজে নারীরা শুধুই তাদের আজ্ঞাবহ।
আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও কমেনি নারীদের প্রতি বিরূপ মনোভাব। কখনো বাল্যবিবাহ, কখনো জোরপূর্বক বিবাহ, উপহারের নাম করে যৌতুকপ্রথা আর সঙ্গে আছে সমাজের কুসংস্কার, যা তিলে তিলে নষ্ট করে দিচ্ছে অনেক নারীর জীবন। কখনো চার দেয়ালের মধ্যে স্বামীর অত্যাচার, তো কখনো পারিবারিকভাবে বাড়ির বউকে নির্যাতন, তথাকথিত সম্মানিত পরিবারগুলোর আড়ালেও এ চিত্র ব্যতিক্রম নয়। এমনকি নিজ সন্তানকে শাসন করার অপরাধেও অধিকাংশ নারীকে নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়েছে। আর এই সন্তানই ভবিষ্যতে এই একই কাজ করবে পারিবারিক শিক্ষায়। পরিবারে নারীর কোনো নিজস্ব স্বপ্ন বা ইচ্ছা থাকতে নেই। প্রথমে মা–বাবার ইচ্ছা, তারপর স্বামী–শ্বশুরবাড়ির ইচ্ছা, আর শেষ জীবনে সন্তানের ইচ্ছা, এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে লাখো জীবন আর তাদের সুপ্ত প্রতিভা।
সবচেয়ে হতাশজনক বিষয় হলো এখনকার অধিকাংশ বাবাই মেয়েকে লেখাপড়া করাচ্ছেন শুধুই বিয়ের তাগিদে। প্রথমে সন্তানকে ভালো ফল করে সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে সঠিক সময়ে জোরপূর্বক নয়তো আবেগ দিয়ে সেসব মেয়ের ভবিষ্যৎই নষ্ট করছে নিজে হাতে। আর তারপর তো থাকছেই সম্মানের দোহাই দিয়ে প্রত্যেক নারীর সঙ্গে চুপচাপ নির্যাতন সয়ে যাওয়ার আজন্ম অভিশাপ।
বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়েদের ৪০ ভাগও কর্মক্ষেত্রে যেতে পারে না, কারণ তাদের বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া পরিবারের প্রথম শর্ত থাকছে শিক্ষিত, মেধাবী, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়ে চাই, কিন্তু ঘর সামলানোর জন্য। আর আমাদের সভ্য সমাজের একটা প্রচলিত কথা আছে, সঠিক বয়সে বিয়ে না হলে মেয়েদের বিয়ে হয় না। এর কারণে অধিকাংশ পরিবারই সব শর্ত মেনে মেয়েকে ঠেলে দেয় অন্ধকারে। আর পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে একসময় এ নারীই ভেবে ওঠে তার বিগত জীবন কেবলই মূল্যহীন। হয়তো একসময় তারা মানিয়েও নেয় আর তার সঙ্গে সমঝোতা করে নেয় নিজের স্বপ্ন আর প্রত্যাশার সঙ্গে।
এখনো বাংলাদেশের পুরুষশাসিত সমাজের কিছু অঞ্চলে পরিবারে পুরুষদের খাওয়ার পরই নারীদের খাওয়ার রীতি আছে। যার কারণে অনেক সময়ই নারীদের সমঝোতা করতে হয় খাবারের সঙ্গেও। লোকাল বাসে নারীদের নামে সংরক্ষিত আসন থাকলেও অধিকাংশ সময়ে দেখা যায় সেটা শুধু নামমাত্রই নারীদের।
কিছুদিন আগে দক্ষিণ ভারতের অভিনেতা বিজয় থালাপতির ‘বিগিল’ সিনেমাটির একটি অংশে দেখানো হয়ে, বাড়ির নারীদের লেখাপড়া করিয়ে সফল কোনো পদ অর্জন করানো হয় শুধু মানুষকে দেখানো বা জানানোর জন্য, কিন্তু তাদের কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার অনুমতি নেই। এটা শুধু চলচ্চিত্রে নয়, বাস্তব জীবনেও প্রতিনিয়ত ঘটে চলছে। কারণ, কোনো নারীর মেধা থাকলে সেটা মানুষকে জানানো পর্যন্তই ঠিক আছে, বাকিটা ঘরের মধ্যেই আবদ্ধ।
সমাজের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক নারীদের নিরাপত্তার অভাব, হোক সেটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্রে। প্রতিটি পরিবারই তাদের মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগে, যা যথেষ্ট সংগতিপূর্ণ এবং এটিও একটি কারণ, যার জন্য পরিবার নারীদের নিজেদের চোখের আড়াল করতে চায় না। অনেক নারীও কর্মক্ষেত্র ও লোকাল বাসে নিরাপত্তাহীনতার স্বীকার হয়ে নিজের ইচ্ছায় নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। এই নারীই ভবিষ্যতে তার মেয়েকে বাধা দেবে নিরাপত্তার কথা ভেবে।
ইতিহাসের খাতায় অনেক যুগ আগে থেকেই নারীরা তাদের পরিচয় দিয়ে আসছে। পরিচিত একটি নাম রানি লক্ষ্মীবাই, নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য যিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলেছিলেন। ম্যারি কুরি, প্রথম নারী বিজ্ঞানী, যিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ম্যারি কুরি বিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন শাখায় দুবার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ইতিহাস তৈরি করেন। তিনিই ছিলেন প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী অধ্যাপক। জোয়ান অব আর্ক, এক সাহসী নারী, যিনি পূর্ব ফ্রান্সের এক কৃষকের ঘরে জন্মেছিলেন। ফরাসি সেনাবাহিনীর হয়ে তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বেই ফ্রান্স জিতে নেয় তাদের বেহাত হয়ে যাওয়া ভূমি। তিনি সপ্তম চার্লসের ক্ষমতারোহণের পেছনেও বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। ইতিহাসে নিজের নাম রেখে যাওয়া আরেক মহীয়সী মার্থা গেলহর্ন বিশ্বের প্রথম যুদ্ধসাংবাদিকতায় নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। নারীরাও যুদ্ধসাংবাদিকতায় পুরুষদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, মার্থা গেলহর্নই প্রথম এ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মাদার তেরেসা, ছোট–বড় সবার কাছেই বহুল পরিচিত একটি নাম। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করে একজন মিশনারি হিসেবে যোগ দেন সিস্টারস অব লোরেটো সংস্থায়। সারা বিশ্বের জন্য তিনি মাদার তেরেসা ছিলেন এক অনুপ্রেরণীয় নারী। তবু সমাজ নারীদেরকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ নয়, বোঝা মনে করে।
নারীদের সমাজের জন্য নয়, তাদের নিজেদের জন্য বাঁচতে দেওয়া উচিত। শুধু নিজের বাড়িতে নয়, নারীদের জন্য নিজেরদের সমাজেও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা উচিত। যখন কোনো বাবা শুধু নিজের মেয়ের নয়, সমাজের সব মেয়ের সম্মান রক্ষার্থে দৃঢ় থাকবে, যখন কোনো ভাই শুধু নিজের বোন নয়, সমাজের সবাইকে বোনের সম্মানে আগলে রাখবে, তখন এ সমাজে নারীদের নিরাপত্তার জন্য প্রশাসন লাগবে না, প্রত্যেক নারী নিজের সমাজে নির্ভয়ে এগিয়ে যেতে পারবে। নারীদের প্রথম প্রয়োজন নিজের পরিবারের সহযোগিতা, যে ক্ষেত্রে প্রত্যেক মা–বাবাকেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে সন্তানের পাশে দাঁড়াতে হবে।
নারীদেরও নিজেদের অধিকার আদায়ে ও সম্মান রক্ষার্থে সজাগ হতে হবে। নিজের স্বপ্নপূরণে লড়াই করতে হবে। সমাজের মানুষ যখন নারীকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি না ভেবে ভবিষ্যতের কারিগর ভাবতে পারবে, তখন নারীরা একজন সফল মা হওয়ার পাশাপাশি একটি সুষ্ঠু সমাজের স্থপতি হতে পারবে, কারণ যে জন্মদাত্রী মা একসঙ্গে ২০টি হাড্ডি ভেঙে যাওয়ার ব্যথা থেকেও বেশি ব্যথা সহ্য করে সন্তান জন্ম দিতে পারে, সেই মা সন্তান, সংসার এবং নিজের স্বপ্ন একসঙ্গে পালনও করতে পারবে।
*লেখক: স্মিতা জান্নাত, ইংরেজি ভাষা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়