বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২৭ মার্চ সকালে সামছুল করিমকে খবর দিই, লালদীঘির পাড়ে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকে বিদেশ থেকে এলসির মাধ্যমে আসা চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লাস্থ আবদুর রহিম আর্মস কোম্পানির আমদানি করা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যাংকের স্ট্রংরুমে মজুত আছে। আমি ও সামছুল করিম প্রথমে একত্রে ইপিআরের (বাঙালি পুলিশ) সন্ধানে বের হলাম। ইপিআর পাওয়ার পর ব্যাংকের দায়িত্বে থাকা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (ম্যানেজার) পি আর চক্রবর্তী ও সাব ম্যানেজার এম এ গফুর সাহেবের বাসায় সামছুল করিম ও ইপিআর সদস্য ছয় থেকে সাত জন যান। পি আর চক্রবর্তী ও এম এ গফুর সাহেবের বাসার সন্ধান আমি দিই সামছুল করিমকে। ব্যাংকের ভোল্ট, স্ট্রংরুম ও লকারের দায়িত্ব এই দুই কর্মকর্তার কাছেই ছিল। দুই কর্মকর্তাকে বাসা থেকে ধরে এনে সামছুল করিম এবং ইপিআর সদস্যরা প্রথমে ব্যাংকের তালা খুলে পরে স্ট্রংরুমে ঢুকে অস্ত্র বের করেন। ব্যাংকের ভোল্টের চাবি সেই মুহূর্তে সামছুল করিমের হাতে ছিল। ওই সময় ব্যাংকের ভোল্টে পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা ছিল। চাইলে সব টাকা সামছুল করিম ইপিআর সদস্যদের সহায়তায় নিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তাঁর ন্যায় ও সততা ছিল বিধায় কেউ সেদিন টাকার লোভ করেননি। তা ছাড়া সামছুল করিম ব্যাংকে প্রবেশের আগে প্রত্যেক ইপিআর সদস্যকে বলেছিলেন, ‘আমরা শুধু অস্ত্র নেব, অন্য কিছু নয়।’ ১৯৭১ সালে লালদীঘির পাড়ের ব্যাংকের শাখাটি ছিল আঞ্চলিক অফিস। চট্টগ্রামের অন্যান্য শাখার অতিরিক্ত টাকা লালদীঘি মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের এ শাখায় জমা হতো। ইপিআর সদস্যদের উদ্দেশে সামছুল করিম বলেন, ‘দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তাই আমাদের অস্ত্রের দরকার, অস্ত্র ছাড়া অন্য কিছুর মধ্যে আমরা কেউ হাত দেব না।’ এসব কথা আমি জানতে পারি ব্যাংকের কর্মকর্তা পি আর চক্রবর্তীর কাছ থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর।

ইপিআর সদস্যরা সব অস্ত্র নেওয়ার পর ভোল্টের চাবি ও ব্যাংকের চাবি ব্যাংকের দায়িত্বে থাকা উর্ধ্বতন কর্মকর্তা পি আর চক্রবর্তীকে সামছুল করিম নিজ হাতে বুঝিয়ে দেন। সামছুল করিম পি আর চক্রবর্তীকে বলেন, ‘দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তাই বাঙালিদের অস্ত্রের প্রয়োজন। ব্যাংকের ভোল্টে টাকার মধ্যে আমরা কেউ হাত দিইনি, যুদ্ধ করার জন্য শুধু অস্ত্র নিয়েছি।’ এ ঘটনার সময় আমি ব্যাংকে যাইনি। কারণ, আমি ব্যাংকে চাকরি করি। ওই ঘটনার সময় আমার ব্যাংকে প্রবেশ করা ও উপস্থিত থাকাটা সমীচীন হবে না ভেবে লালদীঘির অদূরে কোতোয়ালির মোড়ে ছিলাম। আমি এ দুঃসাহসিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলাম, তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি। পরে দেশ স্বাধীন হলে এ ঘটনায় আমার জড়িত থাকার বিষয়টি ব্যাংকের সবাই জানতে পারেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিষয়টি ছিল অনেক সম্মানের ও গৌরবের। এ ঘটনার সময় ব্যাংকের নিরাপত্তায় থাকা দুই কর্মী বেশি বাড়াবাড়ি এবং ব্যাংকে প্রবেশে বাধা দেওয়ার কারণে ইপিআরের গুলিতে নিহত হন। তাঁরা ছিলেন বিহারি। ব্যাংকের বাইরে সাধারণ কিছু মানুষ এ ঘটনার সময় সামছুল করিম ও ইপিআর সদস্যদের দারুণ সমর্থন করেন। ব্যাংকের ভেতর অপারেশনটি করতে প্রায় ১৫ মিনিট সময় লাগে।

default-image

ব্যাংক থেকে অস্ত্র নেওয়ার পর কোতোয়ালির মোড়ে আমরা একত্র হই। সামছুল করিম এবং ইপিআর সদস্যরা ব্যাংক থেকে কোতোয়ালির মোড়ে এসে আমার সঙ্গে মিলিত হবেন, সেই প্ল্যান আগেই করা ছিল। পরে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক (সাবেক মন্ত্রী) তৎকালীন মুজিব বাহিনীর বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ মান্নানের নিকট নগরীর স্টেশন রোডের একটি রেস্টহাউসে আমরা অস্ত্র পৌঁছে দিই। এম এ মান্নান অস্ত্র পেয়ে বলেন, ‘অল অব ইউ আর ব্রেভ অ্যান্ড গ্রেট ফাইটার।’ এ ঘটনার পরপরই আমি আবার চলে যাই কক্সবাজারের রামুতে। সেখানে মাসখানেক থাকি। একপর্যায়ে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিই, যদি চাকরি চলেও যায়, তারপরও চট্টগ্রামে আর চাকরি করব না। ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পি আর চক্রবর্তীকে রামু থেকে টেলিফোনে বলি, ‘যেহেতু যুদ্ধে চট্টগ্রাম শহরের পরিস্থিতি খুব খারাপ, এ জন্য আমার চট্টগ্রামে থাকার ইচ্ছা নেই; নোয়াখালীতে চাকরির বদলির ব্যবস্থা করলে আমার খুব উপকার হবে এবং আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব।’

আমার বাড়ি নোয়াখালীতে। পরিবার সেখানে থাকে। পি আর চক্রবর্তী আমার প্রতি সদয় ছিলেন এবং তিনি সবার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করতেন। অল্প কিছুদিন পরই তিনি নোয়াখালীতে আমার বদলির ব্যবস্থা করেছিলেন। এ জন্য তাঁর প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ। এরপর অনেক কষ্টে নোয়াখালীতে চলে যাই এবং সেখানে গিয়ে চাকরিতে যোগ দিই। নোয়াখালীতে গিয়ে কিছুদিন পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চাঁদা তুলতে থাকি এবং একসময় বিভিন্ন ব্যবসায়ী থেকে পর্যায়ক্রমে এক লাখ টাকা সংগ্রহ করি। নোয়াখালীর তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য এম এ রশিদকে যুদ্ধের সময় ধাপে ধাপে এক লাখ টাকা বুঝিয়ে দিই। পরবর্তীকালে দেশ স্বাধীন হলে তিনি আমাকে জয় বাংলা লিখিত একটি প্যাডে সার্টিফিকেট দেন।

default-image

যুদ্ধকালে নোয়াখালী থেকে জানতে পারি, লালদীঘিতে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের ঘটনার অল্প কিছুদিন পরই পাকিস্তান সেনাবাহিনী সামছুল করিমকে ধরার জন্য হন্যে হয়ে চট্টগ্রাম শহরের আনাচে-কানাচে খুঁজতে থাকে এবং তাঁকে ধরার জন্য হুলিয়া (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা) জারি করে অভিযান চালায়। সামছুল করিমের আপন চাচাতো বোন মনোয়ারা বেগম যুদ্ধের সময় বাকলিয়ায় নিজ বাসায় তাঁকে আশ্রয় দেন। সামছুল করিম সেখানে কিছুদিন থেকে আবার অন্য জায়গায় চলে যান। সামছুল করিম সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান দাউদ পেট্রোলিয়াম লিমিটেড (বর্তমান নাম মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড) চট্টগ্রাম সদরঘাট অফিসের ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তাঁকে ধরার জন্য উক্ত অফিসে প্রায়ই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হানা দিত এবং অফিসের প্রতিটি কক্ষে তল্লাশি চালাত। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ফলে অফিসে দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির বিষয়ে দাউদ পেট্রোলিয়াম লিমিটেড কর্তৃপক্ষ তাঁকে প্রথমে নোটিশ ও পরে চিঠির মাধ্যমে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়। হুলিয়া জারি হওয়ার পরও সামছুল করিম থেমে থাকেননি। তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি থেকেও যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে মুজিব বাহিনীর বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ মান্নানের সঙ্গে এবং পরবর্তীকালে আগস্ট মাস থেকে মুক্তিবাহিনীর শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা জিন্নাহ গ্রুপের মো. জিন্নাহর কমান্ডের অধীনে সক্রিয়ভাবে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে গেরিলা যুদ্ধে সহায়তা ও অংশগ্রহণ করেন।

৯ মাস পর দেশ স্বাধীন হলে তাঁর আগের চাকরি সম্মানের সঙ্গে ফিরে পান এবং আবার চাকরিতে যোগ দেন। চাকরিজীবনে ও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে কখনো কারও সঙ্গে আপস করেননি। তিনি মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে কাজ করে ভূয়সী প্রশংসা ও সুনাম অর্জন করেন এবং ১৯৯৯ সালের ১ জানুয়ারি ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। সামছুল করিম চট্টগ্রাম সরকারি কলেজিয়েট হাইস্কুল, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ও চট্টগ্রাম নাসিরাবাদ সরকারি পলিটেকনিক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রাক্তন ছাত্র এবং চট্টগ্রাম নাসিরাবাদ সরকারি পলিটেকনিক কলেজে ছাত্রসংসদের নির্বাচিত প্রথম জিএস ছিলেন। তা ছাড়া চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ষাটের দশকে তিনি ছিলেন তুখোড় ছাত্রনেতা এবং পরে ৬৯–এর স্বৈরাচার আইয়ুব খানের সরকারবিরোধী গণ–অভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

সামছুল করিম অবিভক্ত বাংলার এসডিও এবং সিলেট জেলা শহরের সাবেক এডিসি মরহুম মো. আলী করিমের জ্যেষ্ঠ পুত্র। সামছুল করিমের ছেলে মো. জিয়াউল করিম রূপম সাবেক ক্রিকেটার। ২০১৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বীর মুক্তিযোদ্ধা সামছুল করিম ভারতের বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চট্টগ্রামস্থ পূর্ব ফিরোজ শাহ হাউজিং এলাকায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

default-image

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাথমিক সময়ে (২৭ মার্চ) চট্টগ্রাম লালদীঘির পাড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের ওই দুঃসাহসিক ঘটনায় সামছুল করিমের অদম্য সাহস ও নৈতিকতাকে আমি স্যালুট জানাই। জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশের জন্য এই অসামান্য বীরোচিত অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতা পদক লাভের যথেষ্ট যোগ্যতা তিনি রাখেন। বিশেষ করে, চট্টগ্রাম পূর্ব ফিরোজ শাহ হাউজিং এলাকায় মো. সামছুল করিমের নামে একটি সড়কের নামকরণের জন্য মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নিকট বিনীত অনুরোধ করছি। ১৯৭১ সালের এই সূর্যসন্তানের প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর সততা, নৈতিকতা, ত্যাগ ও দেশপ্রেম বাংলাদেশের স্বাধীনতা–পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একটি উজ্জ্বল ও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।


লেখক: এ কে এম লুৎফুল করিম, সাবেক এজিএম, রূপালী ব্যাংক লিমিটেড, লালদীঘি শাখা, চট্টগ্রাম।

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন